হামের প্রাদুর্ভাবে দেশজুড়ে উদ্বেগ: শিশু মৃত্যু ও হাসপাতালে রোগীর ভিড়
দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি মাসেই কমপক্ষে ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোরসহ সাত জেলায় রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের ব্যাপারে যথাযথ মনোযোগ না দেওয়ায় পরিস্থিতি এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।
হাসপাতালে রোগীর চাপ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান
গতকাল শনিবার রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর ভিড় ও লম্বা লাইন। অনেক মা-বাবা শিশুদের কোলে নিয়ে হামের চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছেন। হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় হামের রোগীর জন্য মাত্র আটটি শয্যা থাকলেও গতকাল দুপুর পর্যন্ত শুধু হাম ও হাম সন্দেহে রোগী ভর্তি ছিল ১১৭ জন। বিভিন্ন তলার বারান্দা ও মেঝেতে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে মায়েদের শুয়ে থাকতে দেখা গেছে।
হাসপাতালের কনসালট্যান্ট (শিশু স্বাস্থ্য) এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ৪৫০ জন রোগী হাম সন্দেহে এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে ৭০ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে। চলতি মার্চ মাসে তিনটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আজিমপুর থেকে বেশি রোগী আসছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যান্য হাসপাতালের পরিস্থিতিও ভয়াবহ। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল ৭০ জন রোগী ভর্তি ছিল এবং এ বছর ১২টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে তিনটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১১ দিনে ১০৫ জন হামের রোগী ভর্তি হয় এবং তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
টিকার ঘাটতি ও প্রাদুর্ভাবের কারণ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান বলেন, ‘সারা দেশেই কমবেশি হাম আছে। তবে আমরা ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোরে বেশি রোগী দেখতে পাচ্ছি।’ তিনি আরও জানান, দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা হাসপাতালকে হাম রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।
তবে টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভির স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার নিজাম উদ্দিন আহমেদ সতর্ক করে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য মারাত্মক উদ্বেগজনক। সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’
জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, শিশুরা নিয়মিত টিকা পাচ্ছে না। দেশে বেশ কয়েক বছর হাম ও রুবেলা টিকার ক্যাম্পেইনও হয় না। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কেন্দ্রীয় গুদামে হাম–রুবেলার টিকার মজুত শূন্য। কোন জেলা বা কোন উপজেলায় টিকার মজুত ফুরিয়ে গেছে, তা তাঁর জানা নেই।
হামের লক্ষণ ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হাম সাধারণত শিশুদেরই হয়। প্রথমে জ্বর হয়, যা তীব্র হতে থাকে। এরপর মুখমণ্ডলে র্যাশ উঠতে শুরু করে এবং তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। শিশুদের এ সময় নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। শিশুদের এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে বা হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
হাম খুবই সংক্রামক রোগ এবং অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একজন আক্রান্ত হলে তার থেকে ১৫–১৮ জন সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই রোগ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং শিশুমৃত্যু বাড়তে পারে।
বর্তমান পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
হামের রোগীদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা জাহান বলেন, ‘কোনো রোগী না থাকায় কালাজ্বরের ওয়ার্ডে হামের রোগী রাখা হচ্ছে। এইডসের কিছু রোগীকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। বাকি অংশ হামের রোগীদের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।’ তবে নতুন সমস্যাও দেখা দিয়েছে, কারণ এখন বসন্ত রোগের মৌসুম এবং গতকাল ১০ জন বসন্তের রোগী ভর্তি ছিল।
বিশেষজ্ঞরা হাম বেশি ছড়িয়েছে এমন এলাকাগুলোতে গণটিকাকরণের (মাস ক্যাম্পেইন) ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে গণটিকাকরণের জন্য পর্যাপ্ত টিকা নেই বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় দ্রুত টিকাদান, শক্তিশালী নজরদারি, সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



