ডায়রিয়ায় মৃত্যু: পুষ্টিহীনতা ও অবহেলার মারণ চক্র
ডায়রিয়ায় মৃত্যু: পুষ্টিহীনতা ও অবহেলার চক্র

ডায়রিয়ায় মৃত্যু: পুষ্টিহীনতা ও অবহেলার মারণ চক্র

আটাত্তর বছর বয়সী আনোয়ার হোসেন দুদিন ধরে পেট ফাঁপা সমস্যায় ভুগছিলেন। সন্ধ্যায় তিনি বমি করেন, এরপর শুরু হয় পাতলা পায়খানা। রাতভর এই অসুস্থতা চলতে থাকে, সকালে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। হাসপাতালে আনার পথেই নিস্তেজ হয়ে পড়েন এই বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি। হাসপাতালে পৌঁছালে, চিকিত্সক এসে দেখার আগেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। পরে চিকিত্সক জানান, পানি শূন্যতার কারণেই আনোয়ার হোসেনের মৃত্যু হয়েছে। আরও আগেই তাকে হাসপাতালে আনার প্রয়োজন ছিল বলে মত দেন চিকিত্সকরা।

ডায়রিয়া: একটি সাধারণ ও অবহেলিত রোগ

দেশে ডায়রিয়া এখনো একটি সাধারণ এবং অবহেলিত রোগ হিসেবে রয়ে গেছে। দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে এ রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় ডায়রিয়াকে গুরুত্ব না দেওয়ায় বা দেরিতে চিকিৎসা নেওয়ার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, পুষ্টিহীনতা এবং ডায়রিয়া এক ধরনের ‘দুষ্টচক্র’ তৈরি করে। একদিকে পুষ্টিহীনতা ডায়রিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়, অন্যদিকে বারবার ডায়রিয়া হওয়ার ফলে শরীর আরও বেশি পুষ্টিহীন হয়ে পড়ে। ফলে রোগীর সুস্থ হওয়া কঠিন হয়ে যায় এবং দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে।

সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ

সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ইতিমধ্যে এ সমস্যা মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পুষ্টি কর্মসূচি, টিকাদান, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগ আরও সমন্বিত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আমাদের দেশে দৈনিক ৮০ জন ও বছরে ৩০ হাজার মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এর অন্যতম কারণ অনিরাপদ খাদ্যগ্রহণ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সচেতনতা বৃদ্ধির জরুরি প্রয়োজন

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে জরুরি হলো সচেতনতা বৃদ্ধি। পরিবার পর্যায়ে সুষম খাদ্য গ্রহণ, শিশুদের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং ডায়রিয়া হলে দ্রুত ওআরএস ও চিকিৎসা নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নিরাপদ খাদ্য ও পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুষ্টিহীনতা এখনো একটি বড় সমস্যা। পর্যাপ্ত ও সুষম খাদ্যের অভাব, খাদ্যের ভেজাল এবং নিরাপদ খাদ্যব্যবস্থার ঘাটতি মানুষের শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি তৈরি করছে। ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা ডায়রিয়ার মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

চিকিৎসকদের মতে, পুষ্টিহীন শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া সবচেয়ে বেশি মারাত্মক রূপ নেয়। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে শরীর থেকে দ্রুত পানি ও লবণ বের হয়ে যায়, যা ডিহাইড্রেশন সৃষ্টি করে। অপুষ্ট শরীর এই ধকল সহ্য করতে পারে না, ফলে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বলেন, অনিরাপদ খাদ্যের কারণে প্রতি ১০ জনে একজন অসুস্থ হয়। অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে প্রতি বছর বিশ্বে পাঁচ বছরের নিচে ৪ লাখ ২০ হাজার শিশুর মৃত্যু হয়। বাংলাদেশে বছরে ৩৫ হাজার মানুষ অনিরাপদ খাদ্যের কারণে মারা যায়।

খাদ্য নিরাপদ রাখার উপায়

খাদ্য নিরাপদ রাখার উপায় সম্পর্কে ড. খালেদা ইসলাম বলেন:

  • খাবার পরিষ্কার রাখতে হবে।
  • রান্না ও কাঁচা খাবার একসঙ্গে রাখা যাবে না।
  • রান্না করতে হবে ঢেকে।
  • খাবার সঠিক তাপমাত্রায় রাখতে হবে।
  • রান্নায় নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে হবে।

বাজার থেকে কী ধরনের খাবার কিনতে হবে জানিয়ে খালেদা ইসলাম বলেন, ফল, শাকসবজি কেনার সময় রং ঠিক আছে কি না তা দেখতে হবে। মৌসুমি ফল, শাকসবজি কিনতে হবে। এই সচেতনতা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা ডায়রিয়া ও পুষ্টিহীনতার মারণ চক্র ভাঙতে সহায়ক হতে পারে।