২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ২১২১ জন নিহত, ঈদে মৃত্যুহার বাড়ে
২০২৩ সালে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ২ হাজার ১২১ জন নিহত হয়েছেন, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৬ জনের প্রাণহানির সমতুল্য। তবে ঈদের সময়ে এই চিত্র আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। পুলিশ সদর দপ্তরের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ওই বছর ঈদুল আজহার আগের ও পরের ছয় দিনে নিহতের গড় সংখ্যা ১১ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এই সময়কালে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৭০ জনে। উৎসব আনন্দের উপলক্ষ হওয়ার কথা থাকলেও, ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনা বিষাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা পরিসংখ্যানে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
গবেষণায় চিহ্নিত পাঁচটি প্রধান কারণ
পুলিশ সদর দপ্তরের ‘রিসার্চ, প্ল্যানিং অ্যান্ড ইনোভেশন’ বিভাগ ২০২৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চ্যালেঞ্জ ও কৌশল নিয়ে এই গবেষণা পরিচালনা করে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ এই গবেষণা কার্যক্রমে সহায়তা প্রদান করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ঈদের সময় সড়কে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ায় দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। যদিও ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহায় দুর্ঘটনার হার বেশি, তবুও সামগ্রিকভাবে দুই ঈদেই প্রতিবছর প্রায় একই ধরনের চিত্র পরিলক্ষিত হয়। তাই গবেষণা প্রতিবেদনে ঈদের সময় সড়ক ব্যবস্থাপনায় কর্তৃপক্ষকে বাড়তি নজর দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
গবেষণায় সড়ক দুর্ঘটনার জন্য পাঁচটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। বেপরোয়া গাড়ি চালানো সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে, যা ৪২ শতাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। অন্যান্য কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- সড়কের নাজুক অবস্থা – ২৯ শতাংশ
- পথচারী পারাপারের জেব্রা ক্রসিং না থাকা – ১৯ শতাংশ
- যান্ত্রিক ত্রুটি – ৫ শতাংশ
- চালকের নেশাগ্রস্ততা – ৩ শতাংশ
- বিভ্রান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো – ২ শতাংশ
আজিমপুর থেকে গাজীপুর রুটে চলাচলকারী একটি যাত্রীবাহী বাসের চালক হৃদয় মিয়া এই বিষয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “গাড়িচালকদের নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই। অতিরিক্ত সময় ধরে গাড়ি চালানোর কারণে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ক্লান্ত শরীরে গাড়ি চালানোর কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে।” তার মতে, দুর্ঘটনার জন্য কেবল চালক দায়ী নন, পথচারীদের কারণেও অনেক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়।
দুর্ঘটনার ধরন ও আহতদের মানসিক প্রভাব
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা পথচারীকে চাপা দেওয়ার। এরপরেই রয়েছে একটি গাড়ির পেছনে আরেকটি গাড়ির ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা, যা মোট সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনার ২৪ শতাংশ। দুই গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ১৭ শতাংশ। এ ছাড়া চালকের নিয়ন্ত্রণ হারানোর জন্য ১২ শতাংশ, থেমে থাকা গাড়ি ধাক্কা দেওয়ায় ৭ শতাংশ, এবং চলন্ত দুটি গাড়ির পাশাপাশি সংঘর্ষের জন্য ১১ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে।
গবেষণায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ২০০ ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তাতে ফুটে ওঠে আহত ব্যক্তিদের মানসিক অবস্থার ওপর দুর্ঘটনার নেতিবাচক প্রভাব। গবেষণায় দেখা যায়, আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২১ শতাংশ আতঙ্কে, ১৯ শতাংশ ট্রমায় ভোগেন। ১৭ শতাংশ আত্মবিশ্বাস হারান, ১২ শতাংশ হতাশায় ও ১২ শতাংশ নানা মানসিক সমস্যায় ভোগেন। শারীরিক ব্যথাসহ অন্যান্য সমস্যাও উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৯৮ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনাকে একটি গুরুতর সমস্যা বলে মনে করেন, বাকি ২ শতাংশ এটিকে প্রধান সমস্যা মনে করেন না।
দুর্ঘটনার শিকারদের প্রোফাইল
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৯ শতাংশ পুরুষ, ২৫ শতাংশ নারী ও ৩৬ শতাংশ শিশু। পেশাগত দিক থেকে দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের ২৯ শতাংশ ব্যবসায়ী। এরপর রয়েছে বেকার ১২ শতাংশ এবং গাড়ির চালক ১১ শতাংশ। শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে, দুর্ঘটনায় শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ২৫ শতাংশ অশিক্ষিত, ২৫ শতাংশ এসএসসির দোরগোড়ায় এলেও পাস করতে পারেননি, এবং প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেছেন ২৪ শতাংশ।
আর্থিক অবস্থা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৩২ শতাংশের মাসিক আয় ৫ হাজার টাকার নিচে। ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করতেন ২৮ শতাংশ। গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দুর্ঘটনার শিকার পরিবারগুলোর ৯৬ শতাংশই বলেছে, পরিবারে আহতদের মধ্যে কর্ম সক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
সুপারিশ ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
গবেষণা প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সচেতনতা বৃদ্ধি, আইনের কঠোর প্রয়োগ, উচ্চ দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া, এবং ঈদের সময় বিশেষ সড়ক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। এই পদক্ষেপগুলি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।



