সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে বিধবাদের জীবনসংগ্রাম ও একটি বেসরকারি সংস্থার সহায়তা
খুলনার কয়রা উপজেলার কপোতাক্ষ মহাবিদ্যালয়–সংলগ্ন এলাকায় একটি বেসরকারি সংস্থা সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত জেলে ও বাওয়ালিদের স্ত্রীদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে। রোববারের এই অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বিধবা নারীদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে তাদের জীবনসংগ্রামের করুণ গল্প।
আছিয়া খাতুনের বেদনাদায়ক স্মৃতি
কয়রা উপজেলার কুশোডাঙা গ্রামের বাসিন্দা আছিয়া খাতুনের স্বামী আমীর আলী ২০০০ সালের রমজান মাসে সুন্দরবনে গোলপাতা কাটতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হন। সেই ঘটনার পর বহু বছর কেটে গেলেও স্বামীহারা সেই দিনের স্মৃতি আজও তাকে তাড়া করে ফেরে। তিনি বলেন, ‘কীভাবে যে বাঁইচে আছি, তা আমিই জানি। গ্রামে গ্রামে ঘুইরে ভিক্ষা করি আইনে এতিম তিন মাইয়ার মুখে দুমুঠো ভাত তুলি দিছি।’ স্বামীর মৃত্যুর পর তিন কন্যা নিয়ে শুরু হয় তার কঠিন জীবন। মানুষের সাহায্য নিয়ে তিনি মেয়েদের বড় করেছেন এবং বিয়েও দিয়েছেন।
মোমেনা বেগমের সংগ্রামী জীবন
আরেক বিধবা মোমেনা বেগমের বাড়ি কয়রার মাটিয়াভাঙা গ্রামে। ২০১২ সালে রোজার ঈদের কয়েক দিন পর ভোরে সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে নিহত হন তার স্বামী আতিয়ার মোল্লা। তিনি বলেন, ‘ভাগ্য মাইনে নিছি। অনেক কষ্টে একমাত্র মাইয়েডারে বিয়ে দিছি।’ বন বিভাগ থেকে পাওয়া একটি বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট ভাড়া দিয়ে তিনি এখন সাত দিনে ৩০০ টাকা পান, যা তার জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।
কদবানু বিবির করুণ গল্প
কয়রার চৌকুনি গ্রামের বাসিন্দা কদবানু বিবির স্বামী এনছার আলী মোল্লা সুন্দরবনে গোলপাতা কাটতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর চার সন্তান নিয়ে শুরু হয় তার কষ্টের জীবন। তিনি বলেন, ‘মানষির বাড়ি কাজনকাম কইরে সন্তানগের বড় করিছি।’ দুর্ভাগ্যবশত, স্বামীর মৃত্যুর ১৫ বছর পর তার বড় ছেলে সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হন এবং আরেক ছেলেও মারা যান। এখন তিনি ছোট মেয়ের সংসারে থাকেন।
বেসরকারি সংস্থার উদ্যোগ
ইনিশিয়েটিভ ফ্রেমওয়ার্ক ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের উদ্যোগে সুবিধাবঞ্চিত বিধবা পরিবারের মধ্যে ইফতার ও ঈদবাজার বিতরণ করা হয়। এই ইভেন্টের পার্টনার ছিল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল্লাহ আল বাকী, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের পরিচালক আমিরুল ইসলাম কাগজী, এবং ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা মো. আশিকুজ্জামানসহ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা।
এই উদ্যোগটি সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সাময়িক স্বস্তি এনেছে, কিন্তু তাদের দীর্ঘমেয়াদী সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আরও উদ্যোগের প্রয়োজন বলে মনে করেন স্থানীয়রা।
