জন্মনিরোধক সংকটে উদ্বেগজনক জন্মহার বৃদ্ধি, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন
জন্মনিরোধক সংকটে জন্মহার বৃদ্ধি, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক

জন্মনিরোধক সংকটে উদ্বেগজনক জন্মহার বৃদ্ধি

দেশে বাল্যবিয়ের প্রবণতা, জন্মনিরোধক সামগ্রীর তীব্র সংকট এবং লোকবলের অভাবের কারণে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ ও জন্মহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, জন্মহার যেখানে ২ দশমিক ৩ থেকে কমিয়ে ২-এ নামিয়ে আনার কথা ছিল, সেখানে বর্তমানে তা বেড়ে ২ দশমিক ৪-এ পৌঁছে গেছে। এই অবস্থা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগের বলে মনে করছেন তারা।

মাঠ পর্যায়ে জন্মনিরোধকের তীব্র সংকট

গত এক থেকে দেড় বছর ধরে সরকারি সরবরাহ না থাকায় মাঠ পর্যায়ে সব ধরনের জন্মনিরোধক সামগ্রীর সংকট চলছে। ফলে অনিচ্ছাকৃত ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। সাধারণত সারা দেশে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মাধ্যমে পাঁচ ধরনের জন্মনিরোধক সরবরাহ করে সরকার। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি গর্ভনিরোধক সামগ্রী যেমন আইইউডি (ইন্ট্রা ইউটারিন ডিভাইসেস), ইনজেকশন এবং ইমপ্ল্যান্ট বিনা মূল্যে বিতরণ করা হয়।

এমসিএইচ সার্ভিসেস ইউনিটের পরিচালক ডা. নাছির আহমদ সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, 'গত দেড় বছর যাবৎ আমাদের কনটাসেপ্টিভ লজিস্টিক সাপোর্ট ছিল না—জন্মহার বাড়ার এটা একটা বড় কারণ হতে পারে। তবে গত ১০ বছর আমাদের টিএফআর একই রকম ছিল ২ দশমিক ৩।' তিনি আরো উল্লেখ করেন, 'আমাদের কর্মীসংকট আছে, দীর্ঘমেয়াদি পদ্ধতিগুলো নেই—এসব কারণেও টিএফআর বাড়তে পারে। এসব ঠিক হয়ে এলে হয়তো জন্মহার কমে আসবে। তবে একটা ব্রেক হয়ে গেলে সেটা আবার পূর্বের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে একটু সময় লাগবে।'

প্রজনন হারে ভয়াবহ বৃদ্ধি

গত বছর নভেম্বরে প্রকাশিত 'মালটিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে ২০২৫ (মিকস)'-এর ফলাফল থেকে এই ভয়াবহ পরিস্থিতি সামনে এসেছে। জরিপে দেখা গেছে, প্রজনন হার (টিএফআর) ২০১৯ সালে ছিল ২ দশমিক ৩, যা বেড়ে হয়েছে ২ দশমিক ৪। জরিপে আরো জানা যায় যে:

  • জন্মনিরোধক ব্যবহারের হার কমেছে
  • আধুনিক পদ্ধতির সুবিধা পাওয়ার সুযোগ হ্রাস পেয়েছে

এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, জন্মনিরোধক সামগ্রীর সংকটের সঙ্গে প্রজনন হার বাড়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর বড় অংশ সরকারি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরবরাহ কমে যাওয়া জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

জন্মনিরোধক ব্যবহারের হারেও পতন

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউনিসেফের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সি বিবাহিত নারীদের জন্মনিরোধক ব্যবহারের হার ২০১৯ সালে সর্বোচ্চ ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ ছিল। সেখান থেকে কমে এখন ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। আধুনিক জন্মনিরোধক পদ্ধতির চাহিদা পূরণের হারও ৭৭ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৭৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ও সতর্কতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল হক বলেন, 'জন্মহার বাড়ার জন্য অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করে। এর মধ্যে বাল্যবিয়ে, দারিদ্র্য—এই ফ্যাক্টরগুলো যখন কাজ করে, তখন জন্মহারটা কমে আসার কথা। কিন্তু হঠাৎ করে যদি দারিদ্র্য বেড়ে যায়, যদি বাল্যবিয়ে বেড়ে যায়, তাহলে জন্মহারটা বেড়ে যাবে।'

অধ্যাপক আমিনুল হক আরো সতর্ক করে বলেন, 'আমাদের দেশের ৬ কোটি সক্ষম দম্পতি আছে। তাদের গড়ে দুটি সন্তান জন্ম দেওয়ার কথা, সেখানে তারা যদি ২.৪ সন্তান জন্ম দেয়, তাহলে সেটা আমাদের দেশের জন্য অনেক বেশি এবং আমাদের আনম্যানেজেবল সাইজ হয়ে যাবে। আমাদের জন্মহার নিচের দিকে যাওয়ার কথা ছিল; তা না হয়ে যাচ্ছে ওপরের দিকে, তাহলে সেটা তো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবেই। এখন দেখতে হবে কোন ধরনের মানুষের মধ্যে এর প্রভাব বেশি পড়ছে। গ্রামে না শহরে, কিংবা বস্তিতে কোথায় বেশি—সেই জায়গাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।'

পরিসংখ্যান ও বর্তমান অবস্থা

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫৩ লাখ নারী গর্ভধারণ করেন। এর মধ্যে ৩৩ থেকে ৩৪ লাখ নারী সন্তান জন্মদান করে। বাকি নারীদের গর্ভপাত হয়, যা প্রায় ১৯ লাখের মতো।

এমসিএইচ সার্ভিসেস ইউনিটের উপপরিচালক ডা. আ ন ম মোস্তফা কামাল মজুমদার বলেন, 'জন্মহার আমাদের কমতির দিকেই ছিল। তবে গত ১০ বছর আমাদের জন্মহার (টিএফআর) ২ দশমিক ৩ ছিল। শুধু লজিস্টিক সাপ্লাই না থাকার কারণে এক দেড় বছরে জন্মহার ২ দশমিক ৪ হয়ে গেল।' তবে এই কর্মকর্তা আরো জানান, 'এখনো আমাদের জনগণ সচেতন না। দেশের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মানুষ বিদেশ থাকে। তারা দেশে আসে আবার যায়, তারা পরিকল্পিত গর্ভধারণ করতে পারে না। এখানে কিছু অপরিকল্পিত সন্তানের জন্ম হয়।'

চলমান এই সংকট জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে এমন একসময়ে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যখন গত পাঁচ দশকের মধ্যে দেশে প্রথম বারের মতো মোট প্রজনন হার (টিএফআর) বেড়েছে।