স্নুজ বাটন চাপা: ঘুমের বিজ্ঞানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
সকালে অ্যালার্ম বাজতে শুরু করলে ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি উঠে পড়া অনেকের জন্যই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। স্নুজ বাটন চেপে আরও কয়েক মিনিট ঘুমিয়ে নেওয়ার প্রবণতা প্রায় সবার মধ্যেই দেখা যায়। সাম্প্রতিক একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এই অভ্যাসের গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণার ফলাফল: স্নুজ করা একটি সাধারণ অভ্যাস
বিশ্বের ২১ হাজারেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের স্মার্টফোনভিত্তিক ঘুমের তথ্য ৬ মাস ধরে সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, রেকর্ড করা রাতগুলোর অর্ধেকের বেশি ক্ষেত্রে মানুষ গড়ে ২.৪ বার স্নুজ বাটন চেপে তারপর বিছানা ছাড়েন। এটি কোনো বিরল ঘটনা নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
স্নুজ বাটন চাপার প্রভাব: ক্ষতি নাকি উপকার?
প্রশ্ন উঠেছে, এই অভ্যাসটি আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কিনা। উত্তরটি সরল নয়, কারণ এটি নির্ভর করে স্নুজ বাটন চাপার পেছনের কারণের ওপর। ঘুমের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হলো র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা আরইএম ঘুম। এই পর্যায় স্মৃতি গঠন, আবেগ প্রক্রিয়াকরণ এবং সৃজনশীলতার জন্য অপরিহার্য। রাতের শেষ ভাগে আরইএম ঘুম বেশি হয়। যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে অ্যালার্ম আগেভাগে সেট করে শুধু স্নুজ করার জন্য, তাহলে তিনি নিজের মূল্যবান আরইএম ঘুমের পর্যায়টি ভেঙে দিচ্ছেন। পরে আবার ঘুমালেও তা সাধারণত হালকা বা আধো আরইএম ঘুম হয়, যা স্মৃতি গঠনের সুযোগ কমিয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতামত: বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ
ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান মেডিকেল স্কুলের স্নায়ুবিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্যাথি গোল্ডেস্টেইন মনে করেন, সকালে কয়েক মিনিটের জন্য আরইএম ঘুম কমে গেলে পরদিনের মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতায় বড় প্রভাব পড়ে, এমন শক্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ অল্প কিছু সময় স্নুজ করলে তা বড় ধরনের ক্ষতি করবে, এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
অন্যদিকে, ব্রিগ্যাম অ্যান্ড ওমেন্স হসপিটালের ঘুমবিজ্ঞানী রেবেকা রবিনস সতর্ক করেছেন, যদি স্নুজের কারণে ঘুম ও জেগে ওঠার সময় প্রতিদিন পরিবর্তিত হয়, তাহলে শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈব ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম বিঘ্নিত হতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে সময়মতো ঘুমানো ও জেগে ওঠা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
স্নুজ করার সম্ভাব্য উপকারিতা
২০২৩ সালের একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষ নিয়মিত স্নুজ করেন, তারা ল্যাব পরিবেশে স্নুজ করার পর জাগার সঙ্গে সঙ্গে কিছু জ্ঞানীয় পরীক্ষায় তুলনামূলক ভালো ফলাফল করেছেন। ধারণা করা হয়, শেষ কয়েক মিনিট হালকা ঘুমে কাটানোর ফলে হঠাৎ গভীর ঘুম থেকে টেনে তোলার মতো ধাক্কা লাগে না। এতে সকালের ঝিমুনিও কিছুটা কমে যায়।
কী করা উচিত? পরামর্শ ও সতর্কতা
যদি কেউ নিয়মিত সময়মতো ঘুমায়, সকালে মোটামুটি সতেজ থাকে এবং বিকেলে তীব্র ঝিমুনি না আসে, তাহলে এক-দুবার স্নুজ করলে আসলে বড় সমস্যা হবে না। কিন্তু যদি কেউ অ্যালার্ম ছাড়া উঠতেই না পারে বা স্নুজ না করলে দিন শুরুই করা যায় না, তাহলে সেটি ঘুমের ঘাটতির ইঙ্গিত হতে পারে। অনিদ্রা, স্লিপ অ্যাপনিয়া, রেস্টলেস লেগস সিনড্রোম বা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে সকালে অতিরিক্ত ঝিমুনি হতে পারে, তখন স্নুজ করা কোনো কাজে লাগে না।
স্নুজ করা নিজেই সমস্যা নয়, সমস্যা হলো এর পেছনের কারণ। যদি শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পায়, তাহলে স্নুজ কেবল কিছু সময়ের জন্য স্বস্তি দেবে। কিন্তু যদি ঘুমের রুটিন ঠিক থাকে, তবে কয়েক মিনিটের স্নুজ হয়তো সকালের ধাক্কাটা একটু কমিয়ে দিতে পারে। গবেষণাটি নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুসারে তৈরি করা হয়েছে।
