স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে আলোচনা: চিকিৎসক সংকট ও সমাধানের পথ
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে আলোচনা: চিকিৎসক সংকট

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে আলোচনা: চিকিৎসক সংকট ও সমাধানের পথ

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের একটি বক্তব্য সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তিন দিন পর নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায় নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, 'মানুষকে যাতে ডাক্তারের পেছনে ঘুরতে না হয়, ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে।' এই মন্তব্যকে অনেকে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব চিত্রের প্রতিফলন বলে মনে করলেও, অন্যদিকে চিকিৎসকদের প্রতি কিছুটা হেয়প্রতিপন্ন করার অভিযোগও উঠেছে।

বাস্তবতা: চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র সংকট

মন্ত্রীর বক্তব্যের বিপরীতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান চিত্র বেশ উদ্বেগজনক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হকের মতে, দেশে প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য মাত্র সাতজন চিকিৎসক রয়েছেন, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা আরও কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর আদর্শ অনুপাত হওয়া উচিত ১:৩:৫, কিন্তু বাংলাদেশে এই লক্ষ্যমাত্রা থেকে ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন অনুসারে, ১৮ কোটি জনসংখ্যার জন্য সরকারি খাতে প্রয়োজন ১ লাখ সাড়ে ৩ হাজার চিকিৎসক, ৩ লাখ সাড়ে ১০ হাজার নার্স এবং ৫ লাখ সাড়ে ১৭ হাজার অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী। বর্তমানে চিকিৎসক ১৭ শতাংশ, নার্স ৮২ শতাংশ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী ৫৬ শতাংশ কম রয়েছে। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩২ শতাংশ পদ শূন্য অবস্থায় পড়ে আছে।

চিকিৎসক অনুপস্থিতির কারণসমূহ

২০২৪ সালের মার্চে ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রবন্ধে চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতির ১৮টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

  • অবকাঠামোগত দুর্বলতা: ছোট কক্ষ, যন্ত্রপাতির অভাব, ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি, পানি ও বিদ্যুতের অপ্রতুলতা।
  • প্রভাবশালীদের চাপ ও সহিংসতা: স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালীদের অনৈতিক চাপ, রোগীর আত্মীয়দের দুর্ব্যবহার।
  • আবাসন ও পারিপার্শ্বিক সমস্যা: উপজেলা পর্যায়ে আবাসন সংকট, সন্তানদের শিক্ষার সুযোগের অভাব, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা।
  • নীতি-সম্পর্কিত সমস্যা: ক্যাডারভিত্তিক অন্যায্যতা, বদলিতে বৈষম্য, উচ্চশিক্ষার সুযোগের ঘাটতি।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামান বলেন, 'চিকিৎসকদের সমস্যাগুলো পুরোনো ও পরিচিত। আন্তরিকতার সঙ্গে সমাধানের চেষ্টা করা প্রয়োজন।'

সমাধানের উপায়: স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি ও সুপারিশ বাস্তবায়ন

জনবল সংকট সমাধানে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নতুন সরকারের আমলে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি। এছাড়া, চিকিৎসকদের বদলি ও পদায়নে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ইতিমধ্যে ৪৮তম বিসিএসের মাধ্যমে সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসকের পদায়নে সফলতা দেখিয়েছে। এই পদ্ধতি নিয়োগ ও বদলিতে স্বচ্ছতা আনতে পারে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা মত দিয়েছেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারেও স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেখা যায়। বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, দেশজুড়ে প্রায় এক লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যার ৮০ শতাংশ হবে নারী।

মন্ত্রীর ব্যাখ্যা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

সমালোচনার প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন স্পষ্ট করেছেন যে, তাঁর বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুপস্থিতির কারণে রোগীদের সেবা বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা রোধ করা। তিনি বলেন, 'আমরা কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের রাখার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে চাই। চিকিৎসকের উপস্থিতি রোগীর সেবা নিশ্চিত করবে।' গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে একটি সভায়ও এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।

সর্বোপরি, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জনবল সংকট দূর করতে সমন্বিত উদ্যোগ, সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং চিকিৎসকদের কাজের পরিবেশ উন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।