শীতে ভেজা চুলে সর্দি-কাশি: দাদির উপদেশ বনাম বিজ্ঞান
শীতের সকালে চুল না শুকিয়েই বাইরে বের হলে প্রায়ই বড়দের বকুনি শুনতে হয়। 'ভেজা চুলে বাইরে যেও না, ঠান্ডা লাগবে'—এই কথাটি শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই প্রচলিত একটি ধারণা। মানুষ সাধারণত বিশ্বাস করে যে, শীতে শরীর ভিজে গেলে বা ঠান্ডা লাগলে সর্দি-কাশি হয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এই ধারণাটি নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেছেন, এবং তাদের ফলাফল মোটেও সরল নয়।
সর্দি-কাশির আসল কারণ: ভাইরাস বনাম ঠান্ডা
চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, সাধারণ সর্দি মূলত রাইনোভাইরাসের মতো ভাইরাসের কারণে হয়, শুধু ঠান্ডা আবহাওয়ার জন্য নয়। তবে শীতকালে জার্মানি বা আর্জেন্টিনার মতো দেশে ঠান্ডা লাগার প্রবণতা বাড়ে, আবার মালয়েশিয়ার মতো উষ্ণ অঞ্চলে বর্ষায় সর্দি-কাশি বেশি দেখা যায়। এ থেকে মনে হতে পারে, আবহাওয়ার পরিবর্তনই মূল কারণ। কিন্তু বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করেন, ঠান্ডা বা বৃষ্টির দিনে মানুষ ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটায়, জানালা-দরজা বন্ধ থাকে, ফলে বদ্ধ পরিবেশে ভাইরাস দ্রুত ছড়ায়। এটিই সম্ভবত শীতকালে সর্দি-কাশি বৃদ্ধির একটি বড় কারণ।
বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা: ভেজা পা ও ঠান্ডা লাগার সম্পর্ক
যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের কমন কোল্ড সেন্টারের পরিচালক রন এক্লেস একটি উল্লেখযোগ্য পরীক্ষা পরিচালনা করেন। তিনি স্বেচ্ছাসেবকদের দুটি দলে ভাগ করে একদলকে ২০ মিনিট ঠান্ডা পানিতে পা ভিজিয়ে রাখতে বলেন, অন্যদলকে শুষ্ক অবস্থায় রাখেন। প্রথম কয়েক দিন তেমন পার্থক্য না দেখা গেলেও, চার-পাঁচ দিন পর দেখা যায়, যারা পা ভিজিয়ে রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে সর্দি-কাশির লক্ষণ দ্বিগুণ বেশি দেখা দিয়েছে। এই গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, ঠান্ডা পরিবেশ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাময়িকভাবে দুর্বল করতে পারে।
কীভাবে ঠান্ডা ভাইরাসকে সক্রিয় করে?
বিজ্ঞানীদের মতে, যখন শরীর অতিরিক্ত ঠান্ডার সংস্পর্শে আসে, তখন নাক ও গলার রক্তনালিগুলো সংকুচিত হয়। এই রক্তনালিগুলো রোগ প্রতিরোধকারী শ্বেত রক্তকণিকা পরিবহন করে। সংকোচনের ফলে শ্বেত রক্তকণিকার প্রবাহ কমে যায়, ফলে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সামর্থ্য হ্রাস পায়। চুল শুকানো বা উষ্ণ পরিবেশে ফিরে এলে রক্তনালিগুলো পুনরায় প্রসারিত হয়, কিন্তু ততক্ষণে ভাইরাসটি বংশবিস্তার করে ফেলতে পারে, যার ফলে সর্দি-কাশির লক্ষণ প্রকাশ পায়।
দাদির উপদেশের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি
দাদির সেই পুরোনো কথার পেছনে হয়তো সম্পূর্ণ সত্যতা নেই, কিন্তু কিছুটা যুক্তি অবশ্যই আছে। ভেজা চুল বা ঠান্ডা লাগা সরাসরি সর্দি তৈরি না করলেও, এটি শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে ভাইরাসের আক্রমণের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। রন এক্লেসের গবেষণায় শুধু লক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, মেডিকেল পরীক্ষা সীমিত থাকায় বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনও বিতর্ক রয়েছে। তবে সতর্কতা হিসেবে শীতকালে চুল শুকিয়ে বাইরে যাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ বলে বিবেচিত হয়।
সারসংক্ষেপে, শীতে ভেজা চুলে সর্দি-কাশি হওয়ার ধারণাটি পুরোপুরি ভুল নয়, তবে এটি সরাসরি কারণ নয় বরং একটি সহায়ক উপাদান। বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যের সমন্বয়ে সতর্ক থাকাই উত্তম পন্থা।
