গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে একটি পাগলা কুকুরের কামড়ে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। কয়েক দিনে কুকুরে কামড়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভ্যাকসিন না পাওয়ায় জলাতঙ্কের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয়দের মাঝে।
মৃত্যুর বিবরণ
মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনোয়ার আলম সরকার। এদিন সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন আফরোজা বেগম (৫০)। তিনি ওই ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ী এলাকার মতিয়ার রহমানের স্ত্রী।
চেয়ারম্যান ও স্থানীয়রা জানান, গত ২২ এপ্রিল উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ি, কঞ্চিবাড়ি এবং পাশের ছাপরহাটী ইউনিয়নের মণ্ডলেরহাট এলাকায় একটি পাগলা কুকুর হামলা চালায়। ওই কুকুরের আক্রমণে দুই শিশু ও নারীসহ অন্তত ১৩ জন গুরুতর আহত হন।
তাদের মধ্যে জলাতঙ্ক রোগে গত ৬ মে মারা যান কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ি গ্রামের নন্দা রানী (৫৫) ও ফুলু মিয়া। দুই দিন পর ৮ মে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রতনেশ্বর কুমার। এরপর মঙ্গলবার রমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় আফরোজা বেগমের। কুকুরের কামড়ে একই এলাকার চারজনের মৃত্যুতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এছাড়া নারী ও শিশুসহ ৯ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের শারীরিক অবস্থা নিয়ে পরিবারের সদস্যরা গভীর উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন।
ভ্যাকসিন সংকটের কারণে দেরি
মৃত রতনেশ্বর কুমারের স্বজনরা জানান, কুকুরে কামড়ানোর পর রতনেশ্বরকে দ্রুত সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় র্যাবিস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন না থাকায় তাকে জেলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেও ভ্যাকসিন না থাকায় বিভিন্ন ফার্মেসি ও ক্লিনিক ঘুরে দীর্ঘ ২৪ ঘণ্টা পর উচ্চমূল্যে একটি টিকা সংগ্রহ সম্ভব হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। আক্রান্ত হওয়ার ১৪ দিন পর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রতনেশ্বর।
স্থানীয় বাসিন্দা খালেক জানান, মানুষ হাসপাতালে গিয়ে টিকা না পেয়ে বাধ্য হয়ে ফিরে আসছেন। ইতোমধ্যে আফরোজা বেগমসহ কয়েকজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় প্রতিনিধিদের উদ্বেগ
কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য তাজরুল ইসলাম বলেন, জলাতঙ্কে তার এলাকায় ২ জন মারা গেছেন। ভ্যাকসিন না থাকায় সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা যায়নি তাদের। সরকারি হাসপাতালে যদি পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন থাকত, এই মৃত্যুগুলো এড়ানো যেত। দ্রুত চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা না হলে হতে পারে আরও প্রাণহানি। আক্রান্তদের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে ছুটতেই কেটে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাইরে থেকে চড়া দামে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করলেও ততক্ষণে ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে র্যাবিস ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে।
কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনোয়ার আলম সরকার বলেন, মঙ্গলবার সকালে রংপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আফরোজ বেগম। আমার ইউনিয়নে এর আগেও তিনজনের মৃত্যু হয়। এ নিয়ে চারজন মারা গেলেন। তিনি বলেন, জলাতঙ্কে একের পর এক মৃত্যু স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের বক্তব্য
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. দিবাকর বসাক বলেন, আমাদের এখানে আক্রান্তদের কেউ চিকিৎসা নেয়নি। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো ভ্যাকসিন সরবরাহ ছিল না। এ মাসে ৩০টি জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ পেয়েছি। এসব ভ্যাকসিন জেলা হাসপাতালগুলোয় সরবরাহ করা হয়। তিনি বলেন, সময়মতো টিকা নিতে পারলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ করা সম্ভব।
এ বিষয়ে গাইবান্ধার সিভিল সার্জন রফিকুজ্জামানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।



