১০০ প্রজাতির মশার মধ্যে মাত্র ৫টি রোগ সংক্রমণের ৯৫% জন্য দায়ী
১০০ প্রজাতির মশার মাঝে ৫টিই রোগ ছড়ায় ৯৫%

মানুষের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাণী আসলে সিংহ, মাকড়সা বা সাপ নয়—বরং ছোট্ট মশা। এই মশাই আমাদের রক্ত চুষে নেয়, শরীরে চুলকানি তৈরি করে এবং নানা রোগ সংক্রমিত করে। আওয়ার ওয়াল্ড ইন ডেটার তথ্য অনুযায়ী, মশার কারণে প্রতিবছর প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার মানুষ মারা যায়। মানুষের হাতে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা সে তুলনায় অনেক কম, যদিও প্রাণঘাতী প্রাণীর তালিকায় মানুষের অবস্থান দ্বিতীয়। ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, ইয়েলো ফিভার, চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাসের মতো সংক্রামক রোগগুলোর প্রায় ১৭ শতাংশ মশার মাধ্যমে ছড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবী ধীরে ধীরে উষ্ণ হচ্ছে। এতে গরমের মৌসুম দীর্ঘ হচ্ছে এবং মশা আগের চেয়ে নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্বাস্থ্যসংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এখন প্রশ্ন হলো মানবজাতি এই সবচেয়ে বড় শত্রুর বিরুদ্ধে কীভাবে লড়বে? আমরা কি নিরাপদে এই রোগবাহী মশাগুলোকে পুরোপুরি নির্মূল করতে পারি? আর যদি করি, তাহলে তার ফলে পরিবেশের ওপর কী ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।

সব মশা ধ্বংস নয়

প্রথমেই বলা দরকার, সব মশাকে ধ্বংস করার প্রয়োজন নেই। পৃথিবীতে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ প্রজাতির মশা আছে। এর মধ্যে মাত্র প্রায় ১০০ প্রজাতির মশা মানুষের রক্ত খায়। লিভারপুল স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের জীববিজ্ঞানী হিলারি র‍্যানসন বলেন, এই ১০০ প্রজাতির মধ্যে মাত্র ৫টি প্রজাতি মানুষের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ রোগ সংক্রমণের জন্য দায়ী।

হিলারি র‍্যানসনের মতে, বিশ্বজুড়ে ব্যাপক মৃত্যু ও অর্থনৈতিক ক্ষতির জন্য দায়ী বলে বিবেচিত এই ৫ প্রজাতির মশা বিলুপ্ত হয়ে গেলে তাতে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এদিকে জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ ড্যান পিচ এই ধারণার সঙ্গে মোটামুটি একমত। তবে তিনি মনে করেন, মশা নির্মূল করা উচিত নাকি এর বিকল্প কী হতে পারে তা বের করা উচিত—তা তুলনা করতে আরও তথ্য দরকার।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পরিবেশের ওপর প্রভাব

হিলারি র‍্যানসন বলেন, যে পাঁচ প্রজাতির মশা সবচেয়ে বেশি রোগ ছড়ায়, তারা মূলত মানুষের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠভাবে অভিযোজিত হয়েছে। অর্থাৎ এগুলো মানুষের কাছাকাছি বাস করে, মানুষের রক্ত খায় এবং মানুষের আশপাশেই বংশবিস্তার করে।

এ কারণে এসব মশাকে নির্মূল করা হলে পরিবেশব্যবস্থার ওপরে বড় আকারে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই। বরং জিনগতভাবে কাছাকাছি কিন্তু কম ক্ষতিকর অন্য কিছু মশা দ্রুত সেই জায়গা পূরণ করে নিতে পারে।

তবে ড্যান পিচ মনে করেন, বেশির ভাগ প্রজাতির মশার পরিবেশগত ভূমিকা সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান এখনো সীমিত। তাই, তাদের নির্মূল করা নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে তিনি মনে করেন, এই অনিশ্চয়তা মেনে নিয়ে হলেও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

ড্যান পিচ আরও বলেন, মশার লার্ভা পানিতে বেড়ে ওঠে এবং সেখানকার পুষ্টি অন্য জায়গায় ছড়িয়ে দেয়। এ ছাড়া মশা অনেক পোকা, মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর খাবার হিসেবেও কাজ করে। কিছু মশা গাছের পরাগায়নেও সাহায্য করে। তবে সব প্রজাতির মশা একইভাবে এই কাজ করে কি না, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

র‍্যানসনের মতে, এ ক্ষেত্রে একটি নৈতিক প্রশ্নও আছে। সেটি হলো মানুষ পুরো প্রজাতিকে বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না? তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেন, মানুষ তো এমনিতেই তাদের নানা কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে অনেক প্রজাতিকে অনিচ্ছাকৃতভাবে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

কীভাবে এটা করা যেতে পারে

মশার সংখ্যা কমানোর সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তিগুলোর একটি হলো জিনগত প্রযুক্তি। এ প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে মশার জিনগত গঠন পরিবর্তন করা হয়, যেন তারা একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য তাদের সন্তানদের মধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হারে ছড়িয়ে দিতে পারে।

যেমন পরীক্ষাগারের গবেষণায় ম্যালেরিয়া ছড়ানোর জন্য দায়ী বলে বিবেচিত অ্যানোফিলিস প্রজাতির স্ত্রী মশাকে জিনগত প্রযুক্তির মধ্য দিয়ে প্রজননে অক্ষম করে দেওয়ার পর দেখা গেছে, ওই পরীক্ষাগারে ওই প্রজাতির মশা নাই হয়ে গেছে।

বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন পরিচালিত সংস্থা ‘টার্গেট ম্যালেরিয়া’ এই প্রযুক্তি নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করেছে। আফ্রিকার কয়েকটি দেশেও এ প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে গত বছর বুরকিনা ফাসোর সামরিক সরকার দেশটিতে এই পরীক্ষার অনুমোদন বাতিল করে দেয়। স্থানীয় কিছু গোষ্ঠীর সমালোচনা এবং ভুল তথ্য ছড়ানোর কারণে এই প্রকল্পটি সেখানে বড় ধাক্কা খায়।

আরেকটি পদ্ধতি হলো এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির মশাকে ওলবাকিয়া নামের একটি ব্যাকটেরিয়া দিয়ে সংক্রমিত করা, যেন এই প্রজাতির মশার সংখ্যা কমে যেতে পারে বা তারা ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়াতে অক্ষম হয়ে পড়তে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো আমাদের কি সত্যিই মশাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে হবে, নাকি শুধু তাদের রোগ ছড়ানোর সক্ষমতা কমালেই তা যথেষ্ট?

মশাগুলোর সংক্রমণ সক্ষমতা নষ্ট করা

ব্রাজিলের নিতেরই শহরে ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়ায় সংক্রমিত অপ্রজননক্ষম মশা ছাড়া হয়েছিল। তখন সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৮৯ শতাংশ কমে যেতে দেখা গিয়েছিল। গত বছরের গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে।

স্কট ও’নিল বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, এখন পর্যন্ত ১৫টি দেশের ১ কোটি ৬০ লাখের বেশি মানুষ এ ধরনের মশার মাধ্যমে সুরক্ষা পেয়েছে। এতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়নি।

ট্রান্সমিশন জিরো নামের একটি প্রকল্পের আওতায় জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেন অ্যানোফিলিস মশা আর ম্যালেরিয়া ছড়াতে না পারে।

গত বছরের শেষ দিকে নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, বিজ্ঞানীরা এই লক্ষ্য অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছেন। গবেষক দলটি ২০৩০ সালে কোনো একটি দেশে এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু করার পরিকল্পনা করছে।

তানজানিয়ার ইফাকারা হেলথ ইনস্টিটিউটের গবেষক ডিকসন উইলসন লোয়েতোইজেরা এএফপিকে বলেন, বুরকিনা ফাসোর অভিজ্ঞতা থেকে এটা বোঝা গেছে, এ ধরনের প্রকল্প সফল করতে হলে যেসব দেশে পরীক্ষা চালানো হবে, সেখানে অবশ্যই কিছু ‘রাজনৈতিক সমর্থন বা গ্রহণযোগ্যতা’ থাকতে হবে।

কোনো ‘ম্যাজিক বুলেট’ নয়

হিলারি র‍্যানসন বলেন, শুধু একটি প্রযুক্তিগত ম্যাজিক বুলেটের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। সাধারণত, এমন সমাধানগুলো বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের মতো সংস্থার অর্থায়নে হয়। তাঁর মতে, এসব রোগ মোকাবিলায় একটি সমন্বিত সমাধান দরকার।

র‍্যানসনের মতে, এ জন্য রোগে আক্রান্ত দেশগুলোর মানুষের জন্য চিকিৎসা, রোগনির্ণয়ের সুবিধা, উন্নত বাসস্থান এবং ভালো টিকা নিশ্চিত করতে হবে।

তবে মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে গত এক বছরে মশাবাহিত প্রায় সব রোগের বিরুদ্ধে অগ্রগতি হুমকির মুখে পড়েছে।