সংখ্যা কখনও কখনও বিবেককে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। দেশে হাম ও হামের উপসর্গে প্রতিদিনই শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যু সংখ্যা ৩৫০ অতিক্রম করেছে। এই সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এই ৩৫০ শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ৩৫০টি পরিবারে থেমে যাওয়া হাসি, ৩৫০টি ছোট কফিন, ৩৫০টি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার সাক্ষ্য। প্রশ্ন হলো— এই মৃত্যুর দায় কার?
এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ এখানে মৃত্যু কোনও দুর্লভ রোগে নয়, এমন এক রোগে— যার বিরুদ্ধে বহু দশক ধরে কার্যকর টিকা আছে। হাম এমন কোনও অজানা ভাইরাস নয়, যার চিকিৎসা নিয়ে বিজ্ঞান এখনও বিভ্রান্ত। বরং এটি এমন একটি রোগ, যাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে বাংলাদেশ একসময় আন্তর্জাতিক প্রশংসা পেয়েছিল। তাহলে আজ কেন হাজার হাজার শিশু হাসপাতালে? কেন ৪২ হাজারের বেশি শিশুর মধ্যে উপসর্গ? কেন প্রায় ৩০ হাজার শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— কেন ৩৫০ জন শিশুকে মরতে হলো?
ছাপ্পান্ন জেলায় সংক্রমণ
ছাপ্পান্ন জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। দেশে এখন এক নীরব মহামারির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে শত শত শিশু ইতোমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পর্যন্ত উদ্বেগ জানিয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই দেশ ব্যস্ত থেকেছে রাজনীতি ও ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে। ২০২৪-এর মাঝামাঝি থেকে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি কার্যত ভেঙে পড়েছে। লক্ষ লক্ষ শিশু হামের টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে, আর সেই অবহেলার ফল এখন মৃত্যু হয়ে ফিরে আসছে।
এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনও পদক্ষেপ স্পষ্ট নয়। সংক্রমণ বাড়ছে, মানুষ মরছে, অথচ জরুরি টিকাদান অভিযান, জাতীয় সংকট ঘোষণা কিংবা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃশ্যমান নেতৃত্ব— কোনোটাই চোখে পড়ছে না। সরকার বদলালেও সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতি উদাসীনতা বদলায় না। জনস্বাস্থ্যের চেয়ে অন্য অগ্রাধিকার যেন বারবার সামনে চলে আসে। সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো, আক্রান্তদের বড় অংশই নয় মাসের কম বয়সী শিশু— যারা জীবনের শুরুতেই রাষ্ট্রের ন্যূনতম সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। এই মৃত্যু কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়, বরং নির্মম রাষ্ট্রীয় অবহেলার প্রতিচ্ছবি।
টিকা সংগ্রহে ভুল সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ছিল দেশের অন্যতম সফল জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ। ইউনিসেফ, গ্যাভি এবং সরকারের যৌথ প্রচেষ্টায় ১৯৮০ সালে পূর্ণ টিকাদান কভারেজ যেখানে ছিল মাত্র ২ শতাংশ, তা ২০২২-২৩-এ ৮২ শতাংশে পৌঁছায়। পোলিও নির্মূল হয়েছে, টিটেনাস নিয়ন্ত্রণ হয়েছে, নতুন নতুন টিকা যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ অবকাঠামো ছিল, অভিজ্ঞতা ছিল, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ছিল। তাহলে কোথায় ভাঙন ধরলো? উত্তরটি উদ্বেগজনক।
টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ইউনিসেফভিত্তিক প্রক্রিয়া থেকে সরে গিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্তটি কাগজে হয়তো ‘স্বচ্ছতা’ বা ‘প্রতিযোগিতা’র নামে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে এটি জনস্বাস্থ্যের ওপর এক বিপজ্জনক প্রশাসনিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। ইউনিসেফ আগেই সতর্ক করেছিল— এতে ক্রয়প্রক্রিয়া ১২ মাস পর্যন্ত বিলম্বিত হতে পারে। জাতীয় টিকাদান পরামর্শক কমিটি আগেই সতর্ক করেছিল— শিশুদের টিকাদান ব্যাহত হলে হামের প্রাদুর্ভাব ঘটবে। লিখিতভাবে বারবার ঝুঁকির কথা জানানো হয়েছিল। তারপরও সিদ্ধান্ত বদলায়নি।
সিদ্ধান্তের মূল্য
এখানেই সবচেয়ে নির্মম প্রশ্নটি উঠে আসে— যখন ঝুঁকির কথা জানা ছিল, তখন কে এই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছিল? কোন যুক্তিতে? কার পরামর্শে? আজ সেই সিদ্ধান্তের মূল্য দিচ্ছে কারা? রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগ্রহণকারীরা নয়— দিচ্ছে শিশু, দিচ্ছে পরিবার, দিচ্ছে দরিদ্র মানুষ।
আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, শুধু টিকা সংকটই নয়— রোগ নজরদারি ব্যবস্থাও ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফ আনুষ্ঠানিকভাবে হামের প্রকোপ বৃদ্ধির তথ্য পায়। প্রশ্ন হচ্ছে— এর আগে কী হচ্ছিল? যখন প্রতিদিন হাসপাতালে শিশু ভর্তি হচ্ছিল, তখন নজরদারি ব্যবস্থা কোথায় ছিল? জেলা থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত রিপোর্টিং ব্যবস্থা কি ঘুমিয়ে ছিল? নাকি কেউ তথ্য চেপে রাখতে ব্যস্ত ছিল?
দেরির প্রতিটি দিন শিশুমৃত্যু বাড়িয়েছে
একটি রোগের প্রাদুর্ভাবে সময়ই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। দ্রুত শনাক্তকরণ, দ্রুত প্রতিরোধ, দ্রুত ক্যাম্পেইন— এগুলোই প্রাণ বাঁচায়। কিন্তু বাংলাদেশে যা হয়েছে, তা হলো উল্টো। তথ্য এসেছে দেরিতে, সিদ্ধান্ত হয়েছে দেরিতে, ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে দেরিতে। আর সেই দেরির প্রতিটি দিন শিশুমৃত্যুর সংখ্যা বাড়িয়েছে। এখানে শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, নৈতিক ব্যর্থতাও আছে।
যখন ইউনিসেফ আগাম অর্থায়ন করে টিকা সরবরাহ বজায় রাখার চেষ্টা করে, তখন সরকারের অর্থছাড়ে বিলম্ব হয়েছে কেন? যখন আগের কার্যকর ব্যবস্থাটি ছিল, তখন সেটি বন্ধ করা হলো কেন? যদি নীতিগত পরিবর্তন আনতেই হয়, তাহলে কি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আন্তর্জাতিক অংশীদার এবং বাস্তব ঝুঁকি মূল্যায়ন ছাড়াই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়? রাষ্ট্র পরিচালনা পরীক্ষাগার নয়। বিশেষ করে টিকাদান কর্মসূচি তো নয়ই।
প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু
এখানে আরেকটি প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে— এই ৩৫০টি শিশুর মৃত্যু কি অনিবার্য ছিল? তথ্য বলছে— না। এই মৃত্যুর বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য ছিল। সময়মতো টিকা, সময়মতো নজরদারি, সময়মতো ক্যাম্পেইন— এসব থাকলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যেতো না। তাহলে দায় কার? দায় সেই সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের, যারা সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছেন। দায় সেই প্রশাসনের, যারা সময়মতো অর্থ ছাড় করতে পারেনি। দায় সেই ব্যবস্থার, যারা রোগের তথ্য সময়মতো প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়েছে। দায় সেই নীতিনির্ধারকদের, যারা পরীক্ষিত জনস্বাস্থ্য কাঠামোকে যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া বদলে দিয়েছেন। দায় আমাদেরও— যদি আমরা এই প্রশ্ন না তুলি, যদি আমরা শুধু সংখ্যাটি শুনে পরের সংবাদে চলে যাই।
প্রকৃতপক্ষে এই বিপর্যয়ের জন্য কে বা কারা দায়ী, তা নিরপেক্ষ ও গভীরভাবে অনুসন্ধান করা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি। কোন ব্যক্তি, কোন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, কোন নীতিগত হঠকারিতা কিংবা কার অবহেলায় টিকা সংগ্রহে বিঘ্ন ঘটলো, রোগ নজরদারি ব্যাহত হলো, আর শেষ পর্যন্ত শত শত নিষ্পাপ শিশুকে প্রাণ হারাতে হলো— জাতির সামনে সেই সত্য তুলে ধরতেই হবে। দায়ীদের শুধু চিহ্নিত করলেই চলবে না, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে, প্রয়োজনে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। কারণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা মানুষের ভুলের মূল্য যদি বারবার সাধারণ মানুষকে, বিশেষ করে শিশুদের জীবন দিয়ে পরিশোধ করতে হয়, তাহলে সেটি শুধু ব্যর্থতা নয়, এক ধরনের নির্মম বিশ্বাসঘাতকতা।
দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি প্রয়োজন
ভবিষ্যতে যেন কোনও ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা শাসক জনগণের জীবন নিয়ে এমন দায়িত্বহীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সাহস না পায়, সেই দৃষ্টান্ত আজই তৈরি করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শাসকের হাতে ক্ষমতা দেওয়া হয় মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়ার জন্য নয়; বরং প্রতিটি জীবনকে নিরাপদ রাখার জন্য, প্রতিটি শিশুকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। একটি শিশুর মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি রাষ্ট্রের বিপর্যয়। ৩৫০টি শিশুর মৃত্যু কোনও ‘দুঃখজনক ঘটনা’ নয়। এটি একটি জবাবদিহিহীন ব্যবস্থার ফল। এখন সময় এসেছে দায় নির্ধারণের, তদন্তের, এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহির। কারণ রাষ্ট্র যদি শিশুদের জীবন রক্ষা করতে না পারে, তাহলে উন্নয়ন, স্মার্ট বাংলাদেশ, ডিজিটাল অগ্রগতি— সবই কেবল স্লোগান হয়ে থাকে। আর ইতিহাস খুব নির্মমভাবে মনে রাখে— শিশুদের মৃত্যুতে যারা নীরব ছিল, তাদেরও দায় ছিল।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট



