দেশে চলতি বছর ১৫ মার্চ থেকে ৩ মে পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ২৯৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য সামনে আসায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। প্রশ্নও উঠছে—হাম কি আগে এতটা প্রাণঘাতী ছিল, নাকি এখন পরিস্থিতি নতুন করে জটিল হচ্ছে?
হাম কোনও নতুন রোগ নয়, কিন্তু কখনোই “নিরীহ” ছিল না
চিকিৎসাবিজ্ঞানে মিজল্স বা হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি শৈশবের পরিচিত অসুখ হলেও ইতিহাস বলছে—এটি সবসময়ই শিশু মৃত্যুর বড় কারণগুলোর একটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, টিকা আসার আগে ১৯৬০ এর দশকে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ২৬ লাখ মানুষ হামে মারা যেত। অর্থাৎ, তখন হাম ছিল শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান ঘাতক রোগ।
টিকা আসার পর বড় পরিবর্তন
হামের টিকা চালুর পর বিশ্বজুড়ে মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমে আসে। ২০০০ সালে বিশ্বে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ, যা পরবর্তী দুই দশকে নেমে আসে প্রায় ১ লাখের কাছাকাছি পর্যায়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, ২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে হামের টিকা প্রায় ৬ কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। এই সাফল্যের কারণে অনেক দেশে হামকে প্রায় নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছিল।
কেন আবার ঝুঁকি বাড়ছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচিতে ঘাটতি, কিছু এলাকায় নিয়মিত ক্যাম্পেইনের অভাব এবং সচেতনতার দুর্বলতা আবারও ঝুঁকিপূর্ণ শিশু গোষ্ঠী তৈরি করছে। যেসব শিশু টিকা পায়নি বা অসম্পূর্ণ টিকা পেয়েছে, তাদের মধ্যে সংক্রমণ দ্রুত ছড়াতে পারে এবং জটিলতা বেশি দেখা দেয়।
সাম্প্রতিক ২৯৪ শিশুর মৃত্যু কী ইঙ্গিত দেয়?
স্বল্প সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে বাংলাদেশে এতসংখ্যক শিশুর মৃত্যু জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এটি শুধু একটি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়—বরং টিকাদান কাভারেজ, স্বাস্থ্যসেবার পৌঁছ, এবং সচেতনতার ঘাটতির প্রতিফলন।
হাম কেন এত বিপজ্জনক?
হাম থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো মারাত্মক জটিলতা হতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই জটিলতাই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিশুর অপুষ্টি বা দেরিতে চিকিৎসা নেওয়া হলে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
শেষ কথা
হাম কোনও নতুন রোগ নয়। ইতিহাস বলছে, টিকা আসার আগে এটি ছিল কোটি মানুষের মৃত্যুর কারণ। টিকার কারণে সেই ভয়াবহতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এলেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আবার সতর্ক করছে—এই রোগ নিয়ন্ত্রণে অবহেলার সুযোগ নেই। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন—নিয়মিত টিকাদান, দ্রুত চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা নিশ্চিত করতে না পারলে, নিয়ন্ত্রণে থাকা রোগও আবার বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।



