মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস পাঁচ দশক ধরে আলোচিত প্রযুক্তি ব্যক্তিত্ব। মাইক্রোসফটকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সফল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পাশাপাশি বিশ্বের নানা প্রান্তের বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন–সংক্রান্ত গবেষণার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন বিল গেটস। বর্তমানে গেটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করা বিল গেটস গতকাল শনিবার শিশুমৃত্যু নিয়ে নিজের ব্লগ সাইট ‘গেটস নোটস’-এ নিজের ভাবনা তুলে ধরেছেন। পাঠকদের জন্য লেখাটি প্রকাশ করা হলো।
প্রিয় চার্ট ও অগ্রগতি
আপনি আমার মতো হলে, আপনার একটি প্রিয় চার্ট আছে। আমার চার্টটি বছরের পর বছর একই রয়েছে। এই চার্ট বছরের পর বছর ধরে অনূর্ধ্ব-পাঁচ বছরের শিশুমৃত্যুর হারের তথ্য তুলে ধরছে। এটি এমন একটি সংখ্যা, যা এই শতাব্দীর শুরু থেকে অর্ধেকে নেমে এসেছে। ২০০০ সালে এক কোটির বেশি মৃত্যু হয়েছিল, ২০২৩ সালে তা ৫০ লাখের নিচে নেমেছে। আমার দৃষ্টিতে, এই তথ্য আমাদের জন্য একটি শক্তিশালী প্রমাণ। আসলে কঠিন সময়েও অগ্রগতি সম্ভব। বিশ্বে টিকা, ওরাল রিহাইড্রেশন বা স্যালাইন, মশারি এবং উন্নত পুষ্টির ক্ষেত্রে যে বিনিয়োগ করা হচ্ছে তা এই চার্ট অনুসারে কাজ করছে।
মৃত শিশু জন্মের ট্র্যাজেডি
যদিও বিশ্বের স্বাস্থ্য পরিসংখ্যানের নিয়ম সফল গল্পকে জটিল করে দিচ্ছে। কাউকে মৃত হিসেবে গণ্য করতে হলে আগে জীবিত হিসেবে জন্মাতে হবে। এমনটা শুনতে সহজ ও ভালোই মনে হয়। আসলে বাস্তবতা ভিন্ন। এখনো প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ গর্ভধারণ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে। প্রায় ২৮ সপ্তাহ বা তার পরে শিশুরা মারা যাচ্ছে। গর্ভাবস্থার এমন পর্যায়ে মা ভ্রূণের নড়াচড়া অনুভব করেন। অনেক অভিভাবক তখন সন্তানের নামও পছন্দ করে ফেলেন। প্রায়ই এই সমস্যা গর্ভাবস্থার শেষ ধাপে বা প্রসবের সময় ঘটে।
এই ট্র্যাজেডি শিশু বেঁচে থাকার হার পরিমাপের কেন্দ্রে থাকা উচিত। তা না করলে সব গুরুত্বহীন হয়ে যায়। মাতৃস্বাস্থ্যের সমস্যা আর শিশুমৃত্যুর সমস্যার বড় প্রভাব এই ঘটনা। জাতিসংঘ ২০২০ সালের আগে মৃত শিশুর জন্মের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈশ্বিক হিসাব প্রকাশ করেনি। এ ছাড়া ধনী ও দরিদ্র উভয় দেশেই মৃত শিশুর জন্ম–সংক্রান্ত গবেষণায় এখনো খুব কম অর্থায়ন করা হয়।
উপাত্তের বৈষম্য
কথায় বলে, যা পরিমাপ করা হয়, তা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আর যা পরিমাপ করা হয় না, তা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বিভিন্ন উপাত্ত বৈষম্য প্রতিফলিত করে। ২০০০ সাল থেকে মৃত শিশুর জন্মের হার মাত্র ৩৪ শতাংশ কমেছে, যেখানে একই সময়ে অনূর্ধ্ব-পাঁচ বছরের শিশুমৃত্যুর হার কমেছে ৫০ শতাংশ। ৮১টি দেশে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ গত ২৫ বছরে মৃতশিশুর জন্মের হারের কোনো অর্থবহ উন্নতি হয়নি। ইউরোপে প্রতি একটি মৃত শিশুর জন্মের বিপরীতে সাব-সাহারান আফ্রিকায় প্রায় ৪০টি মৃত জন্ম ঘটে।
কারণ ও সমাধান
হতাশাজনক বিষয় হলো, আমরা জানি কিসের কারণে এমনটা ঘটে। কীভাবে বেশির ভাগ মৃত শিশুর জন্ম প্রতিরোধ করা যায় তা–ও আমরা জানি। এর অন্যতম বড় কারণ হলো প্রি-একলাম্পসিয়া। এটি গর্ভাবস্থায় রক্তচাপের একটি বিপজ্জনক বৃদ্ধির অবস্থা। প্রতিবছর এর কারণে ৫ লাখ ভ্রূণের মৃত্যু হয়। এটি ৭০ হাজার মাতৃমৃত্যুর জন্য দায়ী। এর বাইরে, অধিকাংশ মৃত শিশুর জন্ম এমন কিছু সমস্যা থেকে তৈরি হয়, যা আমরা ভালোভাবে বুঝি। মায়ের সংক্রমণ, প্রসবের সময় প্রসূতি–সংক্রান্ত জটিলতা এবং চিকিৎসাবিহীন ডায়াবেটিসের মতো দীর্ঘস্থায়ী অবস্থার কারণে শিশুর জন্মের আগেই মৃত্যু হচ্ছে।
যদি আমরা এই সমস্যাগুলো আগে শনাক্ত করতে পারতাম, তবে দেরি হওয়ার আগেই হস্তক্ষেপ করার ভালো সুযোগ থাকে। কিন্তু গ্রামীণ ক্লিনিকে এমন কাজ করা কঠিন। সেখানে বেশির ভাগ গর্ভবতী নারী সেবা নেন। সেখানে প্রায়ই অনির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ–ব্যবস্থা থাকে। কোনো বিশেষজ্ঞ থাকে না আর ল্যাব সরঞ্জামের অভাব থাকে। যখন প্রি-একলাম্পসিয়া স্পষ্ট হয়ে ওঠে বা গর্ভাবকালীন ডায়াবেটিস অনিয়ন্ত্রিত থেকে যায়, তখন অপূরণীয় ক্ষতি হয়। তখন জরুরি চিকিৎসাও কাজে লাগে না।
প্রযুক্তির ভূমিকা: রেমিডিও ক্যামেরা
কয়েক মাস আগে, আমি এমন একটি ডিভাইস হাতে ধরে দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম, যা বিশাল প্রভাব তৈরি করতে পারে। যন্ত্রটি রেমিডিও ফান্ডাস ক্যামেরা। আপনি কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে রোগীর রেটিনার উচ্চ রেজোল্যুশন ছবি পাবেন এই যন্ত্র দিয়ে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার প্রশিক্ষণ নিয়ে একজন কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী এটি ব্যবহার করতে পারেন। ডিভাইসটি আকারে একটি হ্যান্ডহেল্ড ভিডিও ক্যামেরার মতো। এটি ব্যাটারিচালিত এবং এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে বহন করার মতো যথেষ্ট বহনযোগ্য।
কেন রেটিনা ব্যবহার করা হচ্ছে? আসলে শরীরের মধ্যে এটিই একমাত্র স্থান, যেখান থেকে আপনি বাইরে থেকে রক্তনালি দেখতে পারেন। রেমিডিও ভারতের একটি মেডিক্যাল টেক স্টার্টআপ। এর ক্যামেরাটি মূলত ডায়াবেটিক চোখের রোগ পরীক্ষার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। ক্যামেরার সঙ্গে যুক্ত ফোনে থাকা একটি এআই সিস্টেমের মাধ্যমে এটি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ ধরতে পারে। না হলে রক্ত পরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শের প্রয়োজন হতো। এটি ইতিমধ্যে ৪০টি দেশে ১ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি রোগীর ক্ষেত্রে এভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
যদিও একই হার্ডওয়্যার ভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে সেই অবস্থাও চিহ্নিত করতে পারে, যা অনেক বিপজ্জনক গর্ভাবস্থার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গর্ভাবকালীন ডায়াবেটিস প্রি-একলাম্পসিয়া, অকাল জন্ম এবং ভ্রূণের মৃত্যুর ঝুঁকি নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে দেয়। সাব-সাহারান আফ্রিকা বা দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ গ্রামীণ এলাকায় সাধারণত এর কোনো পরীক্ষাই করা হয় না। যেহেতু প্রচলিত পরীক্ষার জন্য গবেষণাগারের প্রয়োজন হলেও রেটিনাল স্ক্যান এ ক্ষেত্রে ভিন্ন পথ দেখায়। রেমিডিওর ডিভাইসটি বর্তমানে ভারতে গর্ভবতী নারীদের সেই অবস্থা পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, যা মৃত শিশু জন্মের কারণ হয়। গবেষকেরা এখন একই হার্ডওয়্যারকে রক্তশূন্যতা এবং উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষার জন্যও উপযোগী করছেন।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
রেমিডিওর মতো একটি সরঞ্জাম একাই মৃত শিশুর জন্মের সমস্যার সমাধান করবে না। আমাদের আরও দক্ষ প্রসব সেবিকা, উন্নত জরুরি প্রসূতি সেবা এবং শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রয়োজন। কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের হাতে থাকা এই ছোট, বহনযোগ্য এবং সাশ্রয়ী রোগ নির্ণয়কারী যন্ত্র সেই ধরনের হাতিয়ার, যা মৃতের সংখ্যাকে পরিবর্তন করতে শুরু করতে পারে, যা দীর্ঘকাল ধরে স্থির হয়ে আছে। এই কারণেই গত বছর আমাদের ফাউন্ডেশন নারী স্বাস্থ্য গবেষণা ও উন্নয়নে ২৫০ কোটি ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এটি এই খাতে আমাদের এযাবৎকালের সর্ববৃহৎ বিনিয়োগ।
আগামী ২৫ বছরের মধ্যে আশা করি, আমার প্রিয় চার্টে দুটি রেখা থাকবে। একটি অনূর্ধ্ব-পাঁচ শিশুমৃত্যুর হার ও অন্যটি মৃত শিশুর জন্মহারের তথ্য দেবে। সঠিক প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে আমি বিশ্বাস করি উভয় রেখা নাটকীয়ভাবে নিচের দিকে থাকবে। উভয়ই শূন্যের কাছাকাছি চলে আসতে পারে।
ভাষান্তর: জাহিদ হোসাইন খান
সূত্র: গেটস নোটস



