দেশে চলমান হাম সংক্রমণে শিশুদের ব্যাপক আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। আজ মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে সংস্থাটি এ উদ্বেগ জানায়।
টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার অভিযোগ
বিবৃতিতে বলা হয়, হামের টিকাদানের ক্ষেত্রে অতীতের অবহেলা, গাফিলতি বা সিদ্ধান্তহীনতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। প্রতিদিন নতুন করে বিপুলসংখ্যক শিশু হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং প্রাণ হারাচ্ছে। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে এভাবে শিশুদের মৃত্যু কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা মেনে নেওয়ার মতো ঘটনা নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, নীতি পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির গুরুতর ব্যর্থতার প্রতিফলন।
প্রশ্ন ও তদন্তের দাবি
আসকের বিবৃতিতে বলা হয়, হাম এমন একটি রোগ যার বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে কার্যকর, নিরাপদ ও স্বল্পব্যয়ী টিকা বিদ্যমান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, যথাসময়ে পর্যাপ্ত টিকা সংগ্রহ, সরবরাহ ও নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি কেন নিশ্চিত করা গেল না? কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো যেখানে প্রতিরোধযোগ্য রোগ মহামারিসদৃশ আকার ধারণ করে শিশুদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে?
গণমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হামপ্রতিরোধী টিকা সংগ্রহে বিলম্ব, ঘাটতি কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা ছিল। যদি তা সত্য হয়ে থাকে, তবে বিষয়টিকে নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। খতিয়ে দেখা জরুরি যে টিকা ক্রয় কেন আটকে ছিল, কোন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত থেমে গিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তিরা কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলেন কি না, কিংবা অবহেলা, অদক্ষতা বা সমন্বয়হীনতার কারণে জনস্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না।
বর্তমান সরকারের ভূমিকা
আসকের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তরও জাতির জানা প্রয়োজন: যদি পূর্ববর্তী সরকার টিকা সংগ্রহে ব্যর্থ হয়ে থাকে, তবে বর্তমান সরকার কীভাবে একই বা অনুরূপ প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই টিকা সংগ্রহ ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করতে সক্ষম হলো? এ পার্থক্যের কারণ কী? কোথায় ছিল বাধা, কারা ছিলেন দায়ী এবং কেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বিলম্বিত হয়েছিল? এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সতর্কতা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং টিকার দুই ডোজে অন্তত ৯৫ শতাংশ কাভারেজ নিশ্চিত করা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে টিকাদান, সীমান্ত এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং হাসপাতালগুলোয় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার সুস্পষ্ট পরামর্শ দিয়েছে। আসক বলে, আন্তর্জাতিক সংস্থার এই সতর্কতা প্রমাণ করে যে পরিস্থিতি কেবল স্বাস্থ্য খাতের সংকট নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও জননিরাপত্তার প্রশ্ন।
সাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা
বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে চিকিৎসা ও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবাকে নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে এবং ১৮ অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, বিশেষত শিশুদের প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে রক্ষা করার রাষ্ট্রের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
আসকের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের পক্ষভুক্ত রাষ্ট্র। সনদের ২৪ অনুচ্ছেদে শিশুদের সর্বোচ্চ মানের স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, টিকাদান ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু তাই শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রক্ষায় ব্যর্থতারও প্রশ্ন।
আসকের দাবি
আসকের বিবৃতিতে কয়েকটি দাবি জানানো হয়। এর মধ্যে রয়েছে:
- অবিলম্বে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা;
- ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, বস্তি, পাহাড় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া;
- আক্রান্ত শিশুদের বিনা মূল্যে ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করা;
- টিকা সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা;
- অতীতের অবহেলা, গাফিলতি বা সিদ্ধান্তহীনতার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।



