দুই মাস ধরে বাচ্চাকে নিয়ে হাসপাতালে। তাঁদের আর হাসপাতালে থাকা–খাওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। মা আর ছোট বোনকে নিয়ে আইসিইউ ওয়ার্ডের সামনে বিষণ্ন হয়ে বসে আছেন শাহিদা খাতুন। গতকাল রোববার সন্ধ্যায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এই চিত্র দেখা গেছে।
পরিবারের দুর্দশা
শিশুটির বয়স এখন চার মাস। তার মধ্যে দুই মাসই কেটেছে হাসপাতালে। সন্তানের চিকিৎসার জন্য শাহিদা খাতুন রিকশাচালক বাবার তিনটি গরু বিক্রি করেছেন। সেই তিন লাখ টাকা শেষ হয়ে গেছে। এখন চিকিৎসার জন্য রাজশাহী শহরে তাঁদের থাকা-খাওয়ার কোনো পয়সা নেই। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ শিশুটির চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু এখন তাঁরা কী খেয়ে থাকবেন, তা–ই নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন।
শাহিদা খাতুনের (১৭) বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার নয়দিয়াড়ী সিরোটোলা গ্রামে। তাঁর স্বামী ডালিম আলী একজন দিনমজুর। তিনি গ্রামে কাজ করছেন। খরচের কারণে কাজ বাদ দিয়ে শহরে এসে থাকতে পারছেন না। শাহিদার সঙ্গে রয়েছেন তাঁর মা পারভীন বেগম আর ছোট বোন সুমাইয়া (৭)। শাহিদার বাবা জুয়েল আলী ঢাকায় রিকশা চালান।
গতকাল রোববার হাসপাতালে গিয়ে জানা গেল, দুপুরে শাহিদাদের কিছু খাওয়া হয়নি। গ্রাম থেকে একটা অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে আসছে। তাতেই বাড়ি থেকে ভাত পাঠানো হয়েছে। বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত তাঁরা সেই ভাতের অপেক্ষায় রয়েছেন।
পরিবারের আবেগঘন অবস্থা
শাহিদার মা পারভীন বেগম বলেন, আট দিন আগে শাহিদার বাপ নাতির মুখ দেখার জন্য রাজশাহীতে এসেছিলেন। কিন্তু নাতি আইসিইউতে থাকার কারণে দেখা হয়নি। তিনি আবার কাঁদতে কাঁদতে ঢাকায় ফিরে গেছেন। এ কথা বলতে গিয়ে শাহিদার মা পারভীন বেগম নিজেও কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, শাহিদার বাবার কান্না দেখে সারা গ্রামের মানুষ কেঁদেছেন। মসজিদে গিয়ে সবার কাছে নাতির জন্য দোয়া চেয়েছেন। গ্রামের লোকও কিছু টাকা দিয়ে সাহায্য করেছেন। নাতির চিকিৎসার জন্য নিজের পোষা তিনটা গরু ছিল, তা তিন লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। সব টাকা চিকিৎসার পেছনে খরচ হয়ে গেছে। তাঁরা একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। তাঁদের আর কিছু নেই। জামাতা দিনমজুর। দিন আনেন দিন খান।
শিশুর অসুস্থতার বিবরণ
শাহিদা খাতুন বললেন, তাঁর বাচ্চার বয়স এখন চার মাস। এর মধ্যে দুই মাসই কাটল হাসপাতালে। প্রথমে বাচ্চার ঠান্ডা লাগা, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়া হয়েছিল। ১০ রোজার দিন দুই মাস বয়সী বাচ্চা নিয়ে প্রথম হাসপাতালে আসেন। টানা ২০ দিন হাসপাতালে ছিলেন। তখন তিন দিন আইসিইউতে রাখতে হয়েছিল। কিছুটা সুস্থ মনে হলে ডাক্তার ছুটি দিয়েছিলেন। মাত্র দুই দিন বাসায় ছিলেন। বাসায় গিয়ে দেখেন, বাচ্চার গায়ে হাম উঠেছে। তখনই হাসপাতাল ফেরত আসেন।
প্রথমবার হাসপাতালে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে আর দ্বিতীয়বার ১০ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। দ্বিতীয় দফায় ভর্তি হওয়ার ১০ দিন পর চিকিৎসক শিশুটিকে আবার আইসিইউতে নিলেন। তখন আইসিইউতে পাঁচ দিন রাখলেন। তারপর আবার ওয়ার্ডে পাঠালেন। হাম ঠিক হলো। কিন্তু হাম–পরবর্তী জটিলতা শুরু হয়েছে। এখন বাচ্চার নিউমোনিয়া, ঠান্ডা লাগা, ফুসফুসের সমস্যা ও রক্তে জীবাণু ধরা পড়েছে। এবার ১০ দিন থেকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। অক্সিজেন খুলে দিলেই শিশুটির অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ
শাহিদা বলেন, এবার আইসিইউতে আসার পর তাঁদের হাতের টাকাপয়সা সব শেষ হয়ে গেছে। তাঁদের আর হাসপাতালে থাকার উপায় নেই। তাঁরা চলে যেতে চান; কিন্তু তিন-চার দিন থেকে আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু শহরে থাকা–খাওয়ার একটা খরচ আছে। তাঁদের আর কোনো উপায় নেই। তাঁরা আর থাকতে চান না।
কথা বলতে বলতেই খবর এল, গ্রাম থেকে একটা অ্যাম্বুলেন্স রোগী নিয়ে হাসপাতালে আসছে। সেই অ্যাম্বুলেন্সে বাড়ি থেকে ভাত পাঠানো হয়েছে। সেই ভাত নেওয়ার জন্য শাহিদার মা ও ছোট বোন ছুটে গেলেন নিচে। নিচে নামতে গিয়ে লিফটের সমস্যা হলো। একজন লিফটের ভেতরে আটকা পড়েছেন। পাশের লিফটের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, সেখানে পারভীন বেগম আর তাঁর ছোট মেয়ে সুমাইয়ার সঙ্গে আবার দেখা হলো। তিনি বললেন, ‘ওই ভাতটা আনতে যাচ্ছি।’
হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, তিন-চার দিন আগে তাঁরা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, কিন্তু সুস্থ না হলে তো বাচ্চাকে ছাড়া যায় না। তাই তাঁরা হাসপাতালের পক্ষ থেকে চিকিৎসা খরচের দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের থাকা–খাওয়ার পয়সাও শেষ হয়ে গেছে। এটাই এখন সমস্যা।



