দেশজুড়ে বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। এই প্রাদুর্ভাবের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সংক্রমিতরা। কারণ, সংক্রমিতদের মাধ্যমে হাসপাতালের ভেতরে এবং বাড়ি থেকে অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ছে এই রোগ। হাসপাতালের শয্যার সংকট ও পর্যাপ্ত আইসোলেশন ব্যবস্থার অভাবে চিকিৎসাধীন শিশুদের অন্যদের সংস্পর্শে আসতে হচ্ছে। ফলে নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে।
হামের সংক্রামকতা ও পরিসংখ্যান
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট এই রোগে একজন আক্রান্ত শিশুর মাধ্যমে ১২ থেকে ১৮ জন টিকা না নেওয়া শিশু সংক্রমিত হতে পারে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৩ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৩৩৪ জনে। এর মধ্যে চার হাজার ৫৯ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মিলিয়ে ১৮ হাজার ৮৪৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আর ১৫ হাজার ৭২৮ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৯ জন মারা গেছেন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ১৯৪ জন।
ডিএনসিসি হাসপাতালের পরিস্থিতি
ডিএনসিসি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ৪২৬ জন রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন। আর ১০০ জন ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ৪৩৬ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় একজনের মৃত্যু হয়েছে, ফলে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২। এখন পর্যন্ত মোট দুই হাজার ১০৭ জন রোগী এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
শয্যাসংকট ও ক্রস ইনফেকশন
রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে তীব্র শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে হাম ও চিকেন পক্সের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীদের একই ওয়ার্ডে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতির কারণে হাসপাতালভিত্তিক সংক্রমণ বাড়ছে। ইতোমধ্যে ভর্তি থাকা শিশুদের মধ্যেও নতুন করে সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ঘটনা
চাঁপাইনবাবগঞ্জে একই ধরনের একটি ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে দেড় বছর বয়সী শিশু তাহমিনাকে প্রথমে জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরে তার নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। পরিবারের দাবি, তাহমিনাকে যে ওয়ার্ডে রাখা হয় সেখানে হামে আক্রান্ত শিশু ছিল। সংক্রমিত রোগীদের সংস্পর্শে আসার পর তাহমিনার মধ্যে হাম রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর তার অবস্থা আরও খারাপ হলে তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং ঢাকা শিশু হাসপাতালে আনা হয়। তবে শয্যা সংকটের কারণে বর্তমানে এই শিশু ডিএনসিসির হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মো. তাজুল ইসলাম বারী বলেন, “হাম রোগীদের অবশ্যই আইসোলেশন রাখতে হবে। হাসপাতাল হোক বা বাড়ি—সব ক্ষেত্রেই আইসোলেশন বাধ্যতামূলক। রোগীর সংখ্যা বেশি হলে অতিরিক্ত শয্যা বা অস্থায়ী ব্যবস্থাপনা, যেমন তাঁবুর ব্যবস্থাও করতে হবে। রোগীদের আলাদা করে না রাখলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।” ডিএনসিসি হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, এক রোগী থেকে আরেক রোগীর মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়াকে ‘ক্রস ইনফেকশন’ বলা হয়। তারা আরও বলেন, পরিবারগুলোর মধ্যেও দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে, যা ‘চেইন অব ট্রান্সমিশন’ বা সংক্রমণের ধারাবাহিক বিস্তার হিসেবে পরিচিত।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকের বক্তব্য
মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, “হাম, চিকেনপক্স এবং মাম্পস—সবই অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। রোগীর চাপ বেশি থাকায় অনেক সময় সঠিকভাবে আইসোলেশন বজায় রাখা সম্ভব হয় না, ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অন্যান্য রোগের চিকিৎসায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় ১০ শতাংশ হামে আক্রান্ত হচ্ছেন।”
সরকারি নির্দেশনা
ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সব সরকারি হাসপাতালকে শয্যা সক্ষমতা বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, হাম বা সন্দেহভাজন হাম রোগীকে শয্যার অভাবে কোনোভাবেই ফিরিয়ে দেওয়া যাবে না। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল প্রধানদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।



