সারা দেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ বেড়েই চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতিকে 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ' হিসেবে চিহ্নিত করে জাতীয় স্তরে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
সংক্রমণের বিস্তার ও উদ্বেগ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত ২৩ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিপুল সংখ্যক শিশু আক্রান্ত হয়েছে এবং টিকাদানের অভাবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। হামের উপসর্গ নিয়ে বেশ কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
সংস্থাটির সাবেক পরামর্শক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা এবং টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'সংক্রমণ পরিস্থিতি বাড়তে থাকায় আমরা বলেছিলাম, হামকে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ঘোষণা করা হোক। এখন সরকারের উচিত জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করা এবং টিকাদান এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।'
রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যু
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ১৯ হাজার ১৬১ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ২ হাজার ৮৯৭ জন রোগী নিশ্চিত হয়েছে। তবে বিস্তারিত বিশ্লেষণে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৯৭৩ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৬৬ জনের। মৃত্যুহার দাঁড়িয়েছে ০ দশমিক ৯ শতাংশ। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম-সম্পর্কিত মৃত্যু হয়েছে ৩০ জনের, যেখানে মৃত্যুহার ১ দশমিক ১ শতাংশ।
এ সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২ হাজার ৩১৮ জন রোগী, যার মধ্যে ৯ হাজার ৭৭২ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি চাপ
হাম রোগীর সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে ঢাকা বিভাগে। ১৫ মার্চ থেকে এ বিভাগে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ৮ হাজার ২৬৩ জন। এরপর রয়েছে রাজশাহী বিভাগে ৩ হাজার ৭৪৭ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২ হাজার ৫১৪ জন এবং খুলনা বিভাগে ১ হাজার ৫৬৮ জন।
ঢাকায় রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায়, যেমন ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল ও বস্তি এলাকা।
শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাসপাতালে আসা রোগীদের ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী শিশু ৬৬ শতাংশ এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৩ শতাংশ। মোট ১৬৬ জন শিশুর সন্দেহভাজন মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যারা মূলত টিকা না নেওয়া দুই বছরের কম বয়সী শিশু।
সংস্থাটি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবের একটি বড় কারণ হলো অনেক শিশু টিকা পায়নি বা হাম প্রতিরোধী টিকার মাত্র এক ডোজ পেয়েছে। আবার কিছু শিশু ৯ মাস বয়সে টিকার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হয়েছে। অধিকাংশ রোগী (৯১ শতাংশ) ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু, যা এই বয়সী শিশুদের মধ্যে বড় ধরনের রোগ প্রতিরোধ ঘাটতি নির্দেশ করে।
হামের বিস্তার ও জটিলতা
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির নাক, মুখ বা গলা থেকে নির্গত ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে সাধারণত উপসর্গ দেখা দেয়, যার মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, কাশি এবং মুখের ভেতরে সাদা দাগ। ফুসকুড়ি সাধারণত মাথায় শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা না থাকলেও বেশির ভাগ রোগী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), অন্ধত্ব ও মৃত্যুর মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। প্রতি এক হাজার রোগীর মধ্যে প্রায় একজনের এনসেফালাইটিস এবং দুই থেকে তিনজনের মৃত্যু হতে পারে।
টিকাদানের ঘাটতি ও পূর্বের অগ্রগতিতে ধাক্কা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, এই প্রাদুর্ভাবের আগে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল। ২০০০ সালে হাম প্রতিরোধী টিকার প্রথম ডোজের কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে বেড়ে ১১৮ শতাংশে পৌঁছায়। দ্বিতীয় ডোজ চালুর পর ২০১২ সালে কভারেজ ছিল ২২ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ১২১ শতাংশ হয়। তবে ২০২৪-২৫ সালে এমআর টিকার জাতীয় পর্যায়ের ঘাটতি এবং নিয়মিত টিকাদানে ফাঁকের কারণে কভারেজ কমে যায়। ২০২০ সালের পর নিয়মিত দেশব্যাপী সম্পূরক হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি না থাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে এবং বর্তমান প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
প্রতিকার ও সুপারিশ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় টিকাদান কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি অনুমোদন করে। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের লক্ষ্য করে ৫ এপ্রিল অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় এবং ২০ এপ্রিল দেশব্যাপী এই কর্মসূচি শুরু হয়। এছাড়া সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত সব হাম রোগীকে ভিটামিন এ দেওয়া হচ্ছে, যা চিকিৎসার একটি জরুরি অংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সব পৌর এলাকায় হাম প্রতিরোধী টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ বজায় রাখার পাশাপাশি নজরদারি জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছে। উচ্চ যাতায়াতপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো, দ্রুত রোগ শনাক্ত ও মোকাবিলা, এবং হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধে রোগীকে আলাদা রাখার ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, যেমন স্বাস্থ্যকর্মী, পর্যটন ও পরিবহন খাতের কর্মী, এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সংক্রমণের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের তিন দিনের মধ্যে টিকা দেওয়ার এবং প্রয়োজনে বিশেষ ইনজেকশন দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।



