হবিগঞ্জ হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রোগীদের ভোগান্তি
হবিগঞ্জ হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ

শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের (মেডিসিন) প্রতিটি বেড রোগী ও তাদের স্বজনে ভর্তি। পাশাপাশি স্যাঁতসেঁতে ও নোংরা মেঝেতে চিকিৎসা নিচ্ছিল বিভিন্ন বয়সী কয়েকজন শিশু। মেঝের রোগীদের একজন দুই বছর বয়সী আবদুল মোমিন। কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসায় সকালে শিশুটিকে লাখাই উপজেলা থেকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন মা মঞ্জুরা বেগম (২৬)। স্যাঁতসেঁতে মেঝের ওপর বিছানাটি আসল রং হারিয়ে কুচকুচে কালো। তার ওপর পলিথিন বিছিয়ে শিশুটিকে কোলে নিয়েছিলেন মঞ্জুরা। শিশুটির পায়ে ক্যানুলায় চলছে স্যালাইন। এমন নোংরা পরিবেশে শিশুটি আরও অসুস্থ হবে কি না জানতে চাইলে মঞ্জুরা বলেন, ‘কিতা করতাম, আর কোনো উপায় আছেনি?’

অভিভাবকদের অভিযোগ

ওয়ার্ডটিতে চিকিৎসাধীন একাধিক রোগীর স্বজন ও অভিভাবকের অভিযোগ, হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে দীর্ঘ সময় অবস্থানের ফলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে এবং নিজেরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। চুনারুঘাট উপজেলার বড়আব্দা এলাকার গৃহবধূ শিবলি আক্তার জানান, তাঁর আট মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে পাঁচ দিন আগে এসেছিলেন এখানে। তখন শিশুটির ঠান্ডা ও জ্বর ছিল। এখানে চিকিৎসাধীন থাকার দুদিন পর থেকে শিশুটির ডায়রিয়া দেখা দিয়েছে। এখন হাসপাতাল থেকে স্যালাইনও দেওয়া হচ্ছে না। ফলে নিজেদের টাকায় তা কিনে শরীরে দিতে হচ্ছে।

রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার সময় ঘড়ির কাঁটা ১১টা ১০ ছাড়িয়েছে। তবে ওয়ার্ডটির কোথাও কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মীর দেখা মেলেনি। এরই মধ্যে ওয়ার্ডটিতে চা-বিস্কুট নিয়ে ঢুকে পড়েন এক হকার। তিনি অবাধে শিশুদের বিছানার কাছে গিয়ে স্বজনদের কাছে পণ্য বিক্রি করছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

টয়লেট ও পানির সংকট

এ সময় রাবেয়া বেগম (৪০) নামের এক নারী স্বপ্রণোদিত হয়ে বলেন, ‘আমাগোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বাথরুমের। তিন দিন ধরে এখানে আছি। কিন্তু বাথরুম ইউজ করার মতো না। চার–পাঁচটা বাথরুম আছে, তবে ব্যবহারের অযোগ্য চারটেই। যেটা একটু ভালো, পুরো ফ্লোরের রোগী ও স্বজনেরা ওইডাতে যায়। খাওয়ার পানি নাই, কোনো বেসিনও নাই।’

বানিয়াচং উপজেলার সাগরদীঘি এলাকার বাসিন্দা রাবেয়া যে কক্ষ থেকে কথা বলছিলেন, সেখানে মোট ছয়টি বিছানা। বারান্দার কোনায় থাকা একমাত্র টয়লেটে পাইপ ব্লক হয়ে উপচে উঠছে নোংরা পানি। তিনি পুরো ফ্লোরের সব টয়লেট দেখান। এগুলোর মধ্যে কেবল একটি ব্যবহার উপযোগী। বাকিগুলোর কোনোটির দরজা নেই, কোনোটি আবার এত নোংরা যে ব্যবহারের উপযোগিতা নেই।

পরিচ্ছন্নতা কর্মীর অবহেলা

কথাবার্তার এক পর্যায়ে দেখা যায়, হামিদা খাতুন (৩০) নামের এক স্বজন নিজ উদ্যোগে কক্ষটি ঝাড়ু দিচ্ছেন। পরে ময়লা নিয়ে রাখেন দরজার এক কোনায়। ওয়ার্ডটিতে ছয়টি বেডের এমন কক্ষ আছে তিনটি। পাশের কক্ষেও আরেক রোগীর নারী স্বজনকে ঝাড়ু দেওয়ার পর মেঝে মুছতে দেখা যায়। এ ছাড়া বিশাল কমনরুমে ছড়ানো বিছানায় চিকিৎসা নিচ্ছে ৮ থেকে ১০ শিশু। ১১টা ৩৭ মিনিটে দেখা মেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নারীর। তিনি ১১টা ৫০ পর্যন্ত কমনরুমের অর্ধেক অংশ ঝাড়ু দিয়ে কোথায় যেন চলে যান। পরে ফিরে আসেন ১২টা ২৫ মিনিটে। শুধু কমনরুমের বাকি অংশ ঝাড়ু দিয়ে শেষ করতে করতে বেজে যায় ১২টা ৩২।

এর মাঝে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চিকিৎসক বলেন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ রোগী ও চিকিৎসকদের জন্যও দরকার। তাঁদের জন্য নির্ধারিত কক্ষটিও ঠিকমতো পরিষ্কার করা হয় না। আর রোগীদের কক্ষগুলোর অবস্থা শিশুদের জন্য খুবই অস্বাস্থ্যকর।

স্বজনদের অসহায়তা

পরিচ্ছন্নতাকর্মী চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর কমনরুমের একটি অংশে কলার খোসা ফেলছিলেন কয়েকজন স্বজন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, ‘আমরা নিজেরাই তো ভালা না। আমরাই নোংরা করি। ময়লা ডাস্টবিনে ফেলি না।’

ছয় বেডের তিন কক্ষের মাঝেরটিতে ইয়াসমিন বেগম (৪৫) বলেন, ‘ওই কোনার বাথরুমে গেছিলাম কালকে। আসার পর আমি সারা দিন বমি করতে করতে ভাতই খাইতে পারছি না। আজকে থেইক্যা পুরান বিল্ডিংয়ের দুই তলার বাথরুম ব্যবহার করতাছি। এখুন আইছি ওইখান থেইকে।’ নাতনির বেডের ভাঙা অংশ দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘ই বেডে বসছি। আমিও পড়ছি, ছেলের বউও পড়ছে। মাজাতে ব্যথা পাইছি। এনে রোগী নিয়ে আসি সুস্থ হওয়ার জন্য। আর ভালো মানুষও অসুস্থ হয়ে যায়।’

হকারদের অবাধ বিচরণ

রোগীদের স্বজনদের কাছে সমস্যার কথা শুনতে শুনতে বেলা ১টা পেরিয়েছে। এর মধ্যে অন্তত চারজন হকার বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আটবার ঘুরে গেছেন শিশুদের মেডিসিন ওয়ার্ডে। মানিক নামের এক হকার বলেন, এখানে ঢুকতে তাঁদের কেউ বাধা দেন না। রোগী ও স্বজনদের উপকারে আসেন। তাই তারা মানা করেন না।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

এসব সমস্যার বিষয়ে হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আমিনুল হক সরকারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা সাধারণত দিনে দুবার মেঝে ঝাড়ু দেন ও মোছেন। প্রয়োজন হলে এর চেয়ে বেশিবারও করেন কাজটি। তবে দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে তাঁদের সতর্ক করা হবে।

টয়লেট সংকটের বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক স্বজন টয়লেটে বাচ্চাদের ডায়াপার ফেলেন। পাইপ চিকন হওয়ায় পরে তা ব্লক হয়ে যায়। সব সমস্যার বিষয়ে গণপূর্ত বিভাগকে জানানো হয়েছে। তারা শিগগিরই পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য সমস্যার বিষয়ে তদারকি করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় রোগীদের স্বজনদের সচেতনতাও জরুরি বলে মনে করেন তত্ত্বাবধায়ক। তিনি বলেন, এ বিষয়ে একটি এনজিওর সহায়তায় শিশু রোগীর স্বজন ও অভিভাবকদের সচেতন করা হয় এবং ভবিষ্যতেও করা হবে।