বিষাক্ত বাংলাদেশ: সিসা ও দূষণ কীভাবে আমাদের সহিংস করে তুলছে?
বিষাক্ত বাংলাদেশ: সিসা ও দূষণে সহিংসতা বৃদ্ধি

যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর আমি ও আমার স্ত্রী আনিকা একটা জিনিস খেয়াল করলাম। এখানকার বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েট কমিউনিটিতে অনেক নতুন মা-বাবা আছেন। প্রতিটি অনুষ্ঠানেই তাঁদের ছোট ছোট বাচ্চারা আসে, সবার সঙ্গে মেশে, খেলে, আনন্দ করে। লক্ষ করার মতো ব্যাপার হলো, এই বাচ্চাগুলো বাংলাদেশের সমবয়সী বাচ্চাদের তুলনায় অদ্ভুতভাবে অনেক বেশি হাসিখুশি ও শান্ত। বাংলাদেশে আমার ছোট বোন ও চাচাতো ভাইবোনদের বড় হতে দেখেছি; তারা এদের তুলনায় অনেক বেশি খিটখিটে ছিল, সামান্যতেই কেঁদে উঠত। অপরিচিত ভিড়ের মধ্যে হলে তো কথাই নেই! অথচ এখানকার বাচ্চারা নতুন পরিবেশে সহজে মিশে যায়, কেঁদে উঠলেও দ্রুত শান্ত হয়। এর পেছনে অবশ্যই মা-বাবার প্রতিপালনের বড় ভূমিকা আছে, তবু প্যাটার্নটা স্পষ্ট।

আত্মনিয়ন্ত্রণের জৈবিক ভিত্তি

এই যে হঠাৎ কান্না বা আবেগের তীব্র বহিঃপ্রকাশ, এটি আসলে একটি জৈবিক ব্যাপার। কান্নার সংকেত তৈরি হয় মস্তিষ্কের গভীরে থাকা অ্যামিগডালা ও তার আশপাশের আবেগ সার্কিটে। কিন্তু সেই সংকেতকে থামানোর ও শান্ত করার কাজটা করে মস্তিষ্কের সামনের অংশ, অর্থাৎ প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। এটাই মূলত আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণ কন্ট্রোলের কেন্দ্র।

আত্মনিয়ন্ত্রণের এই সংকট কিন্তু শুধু শিশুদের নয়, এ যেন আজ আমাদের গোটা জাতিরই সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের পর থেকে আমরা এমন এক জাতিকে দেখছি, যার আত্মনিয়ন্ত্রণ বলে যেন কিছুই অবশিষ্ট নেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গণপিটুনির ভয়াবহতা

এসব নিয়ে ভাবতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তোফাজ্জলের কথা মনে পড়ে। মানসিকভাবে অসুস্থ মানুষটিকে আমাদের তথাকথিত সুস্থ ছাত্ররা পিটিয়ে আধমরা করল, তারপর খানিক বিরতি দিয়ে আবার মারল—এবার পিটিয়ে মেরেই ফেলল। মনে পড়ে দীপু চন্দ্র দাসের কথা—তাঁকে পিটিয়ে গাছে ঝুলিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হলো, আর চারপাশের মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়ল; কারও একবারও মনে হলো না, এবার থামা উচিত। আবরার ফাহাদ থেকে লালচাঁদ সোহাগ—সবাই কি একইভাবে মারা যায়নি? এমন কিছু তরুণের হাতে, যারা কোনোভাবেই থামতে জানে না, নিজেদের থামাতে জানে না; মৃতদেহকেও আঘাত করতে থাকে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এই স্বল্প সময়ে অন্তত সাড়ে তিন শর বেশি মানুষ গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন। প্রচলিত ব্যাখ্যাগুলো নিশ্চয়ই খাটে—শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন, অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বলতা, নতুন নির্বাচিত সরকারের এখনো সবকিছু হাতে নিতে না পারা। কিন্তু এই কাঠামোগত ব্যাখ্যা মানুষের ভেতরকার মানুষ মারার এই আগ্রহকে ব্যাখ্যা করতে পারে না, ব্যাখ্যা করতে পারে না এর গতিকে।

সিসা ও অপরাধের সম্পর্ক

গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশক ছিল যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের চরম সময়। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে এসে হঠাৎ এই অপরাধের হার নামতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞরা একে নানাভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু কোনো একক তত্ত্বে মিলছিল না। কারণ, পতন ছিল গোটা দেশজুড়ে, অথচ যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য ও বড় শহরগুলোর পুলিশিং ও সামাজিক নীতি ছিল আলাদা আলাদা।

এরপর একুশ শতকের শুরুতে অর্থনীতিবিদ রিক নেভিন একটি চমকপ্রদ গবেষণা সামনে আনেন। তিনি দেখান, যুক্তরাষ্ট্রে সহিংস অপরাধের এই উত্থান-পতন গাড়ির জ্বালানিতে সিসা মেশানোর সময়ের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তবে ঠিক ২২ বছরের ব্যবধানে। জ্বালানিতে সিসার ব্যবহার বাড়ার ২২ বছর পর অপরাধ চূড়ায় পৌঁছায়, আর সিসা নিষিদ্ধ হওয়ার ২২ বছর পর অপরাধ নাটকীয়ভাবে কমে আসে। এই ২২ বছর হলো একটি শিশুর প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার সময়।

বাংলাদেশের শিশুদের রক্তে সিসা

ইউনিসেফ ও পিওর আর্থের ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে তিন কোটি শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা বিপৎসীমার (৫ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার) ওপরে। আক্রান্ত শিশুর সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। ২০২৪ সালে আইইডিসিআর, আইসিডিডিআর,বি এবং ইউনিসেফ মিলে চারটি জেলা ও ঢাকার পাঁচ শতাধিক শিশুর রক্ত পরীক্ষা করে দেখে। পরীক্ষিত প্রতিটি শিশুর রক্তেই সিসা আছে, আর ঢাকার ৮০ শতাংশ শিশুর রক্তে তা বিপৎসীমা ছাড়িয়ে গেছে। মনে রাখা দরকার, সিসার কোনো মাত্রাই আসলে নিরাপদ নয়।

সিসার উৎস

প্রধান উৎস তিনটি। প্রথমটি অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিসাইক্লিং। দেশে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবছর আনুমানিক পাঁচ কোটি লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি অকেজো হয়, যার বড় অংশ সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা হাজারের বেশি অনিয়ন্ত্রিত খোলা চুল্লিতে গলানো হয়। দ্বিতীয় উৎস রং। ২০১৮ সালে বিএসটিআই রঙে সর্বোচ্চ ৯০ পিপিএম সিসার সীমা নির্ধারণ করলেও পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থার ২০২৫ সালের গবেষণায় বাজারের ৪২ শতাংশ রঙে এই সীমার বেশি সিসা মিলেছে। তৃতীয় উৎস আমাদের রান্নাঘর—গুঁড়ো হলুদের সাথে মেশানো লেড ক্রোমেট।

সমাধানের পথ

যুক্তরাষ্ট্র তার সিসা সংকটকে চিনতে পেরেছিল প্রায় তিন দশক পর। আমাদের হাতে এত সময় নেই। আজ যে প্রজন্ম রাস্তায় মানুষ মারছে, তাদের মস্তিষ্ক শারীরিক ও সাংস্কৃতিক—উভয় অর্থেই ক্ষতিগ্রস্ত; তাদের আর পুরোপুরি সারিয়ে তোলা যাবে না। কিন্তু যে শিশুটি আজ ভাট্টির পাশে হামাগুড়ি দিচ্ছে, যে শিশুটি সিসামাখা হলুদের ডাল খাচ্ছে, যে শিশুটি ঢাকার দূষিত বাতাস টানছে; তাকে এখনো বাঁচানো যায়। ক্ষতিটা থামিয়ে, আর একটা সুস্থ সংস্কৃতি দিয়ে। তবে তার জন্য আগে স্বীকার করতে হবে যে তারা বিষাক্ত হচ্ছে। আর সেই স্বীকৃতিটাই হয়তো সবচেয়ে কঠিন। কারণ, স্বীকার করা মানেই কাজ শুরু করা।