তীব্র গরমে পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরেও কি আপনার অস্বাভাবিক রকম ঘুম ঘুম ভাব লাগে, শরীরে ক্লান্তি আসে কিংবা মাথায় একধরনের ঝিমঝিম অনুভূতির সৃষ্টি হয়? যদি এমনটা হয়ে থাকে, তবে জেনে রাখুন, এ সমস্যায় আপনি একাই ভুগছেন না। চিকিৎসকদের মতে, প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতার কারণে দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া এবং অলসতা লাগা অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়, যা তীব্র তাপপ্রবাহের সময় আরও বেড়ে যায়।
আসলে পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা বাড়লে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখার জন্য আমাদের শরীরকে অতিরিক্ত খাটতে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘থার্মোরেগুলেশন’ (দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ)। এই বাড়তি শারীরিক পরিশ্রমের পাশাপাশি শরীরে পানির ঘাটতি (ডিহাইড্রেশন), রাতের ঘুমের ব্যাঘাত এবং খাদ্যাভ্যাসের কারণে মানুষ দিনের বেলা চরম ক্লান্তিবোধ করে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, তাপজনিত ধকল বা হিট স্ট্রেস হলো বিশ্বব্যাপী আবহাওয়াজনিত অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি, যা মানুষের শারীরিক ও মানসিক কর্মক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। ঘুমের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, গরমের কারণে রাতের বেলা শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম না পাওয়ায় পরদিন মনোযোগের অভাব ও উৎপাদনশীলতা কমে যায়।
ভারতের হায়দরাবাদের যশোদা হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট জেনারেল ফিজিশিয়ান ডা. কে শশী কিরণ বলেন, ‘গ্রীষ্মকালে অনেকেই পর্যাপ্ত ঘুমানোর পরেও ক্লান্তি আর ঝিমঝিম ভাবের অভিযোগ করেন। এর মূল কারণ শরীর সারাক্ষণ নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকে, যার ফলে দিনের বেলা শরীরে অলসতা ও ঘুম ভাব চলে আসে।’
গরম কেন শরীরকে ক্লান্ত করে?
চিকিৎসকেরা ব্যাখ্যা করে বলছেন যে, মানুষের শরীর একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা সীমার মধ্যে সবচেয়ে ভালো কাজ করে। বাইরে যখন তীব্র গরম থাকে, তখন শরীর নিজেকে ঠান্ডা করার জন্য অতিরিক্ত ঘাম তৈরি করে, রক্ত সঞ্চালন ও হৃদস্পন্দনের গতি বাড়িয়ে দেয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রচুর শক্তি খরচ হয়।
নয়াদিল্লির কৈলাশ দীপক হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান ডা. মানসী নিগম বলেন, ‘তাপমাত্রা বাড়লে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখতে ওভারটাইম কাজ করে। হৃদস্পন্দন দ্রুত হয়, রক্তনালীগুলো প্রসারিত হয় এবং শরীরের মূল ব্যবস্থাগুলো তখন চিন্তাভাবনা বা শক্তি জোগানোর চেয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের দিকে বেশি মনোযোগ দেয়। সে কারণেই গরমে নিজেকে শারীরিকভাবে ভারী এবং মানসিকভাবে মন্থর মনে হয়। এটি কোনও অলসতা নয়, এটি পুরোপুরি জীববিজ্ঞান।’
তিনি আরও জানান, অতিরিক্ত গরমের কারণে তীব্র অসুস্থতা প্রকাশের আগেই শরীরে ক্লান্তি, মাথা ঘোরা ও মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে। আর বাতাস বেশি আর্দ্র (হিউমিডিটি) হলে ঘাম সহজে শুকায় না, ফলে শরীর প্রাকৃতিকভাবে নিজেকে ঠান্ডা করতে আরও বেশি সমস্যায় পড়ে।
রাতের ঘুমের সঙ্গে সুপ্ত সংযোগ
গ্রীষ্মকালে মানুষের ক্লান্ত থাকার অন্যতম বড় কারণ হলো রাতের মানসম্মত ঘুমের অভাব। একটি আরামদায়ক ও গভীর ঘুমের জন্য রাতে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা কিছুটা কমে যাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে শরীর ঠান্ডা হতে পারে না। ফলে ঘুম পাতলা হয়, রাতে বারবার ঘুম ভেঙে যায় এবং গভীর ঘুম ব্যাহত হয়।
জয়পুরের সিকে বিড়লা হাসপাতালের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. নিরঞ্জন সিং বলেন, ‘চারপাশের তাপমাত্রা বেশি থাকলে শরীর সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে পারে না। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুমানোর পরেও সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মেজাজ খিটখিটে থাকে এবং ঘুম ঘুম ভাব কাটে না।’
ভারতের ন্যাশনাল স্লিপ ফাউন্ডেশনের গবেষণাতেও দেখা গেছে, শোবার ঘরের তাপমাত্রা বেশি থাকলে ঘুমের কার্যকারিতা কমে যায় এবং দিনের ক্লান্তি বাড়ে। গরমের কারণে ‘অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’র মতো ঘুমের সমস্যাগুলোও আরও প্রকট হতে পারে।
পানির ঘাটতি কেড়ে নেয় শরীরের শক্তি
চিকিৎসকদের মতে, গরমের দিনে ক্লান্তির পেছনে শরীরে মৃদু পানির ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশনকে সবচেয়ে বেশি অবহেলা করা হয়। সামান্য পানি কম হলেও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যায় এবং মাথা ঘোরা বা মাথাব্যথা শুরু হয়। অনেকেই তৃষ্ণা পাওয়ার আগপর্যন্ত পানি পান করেন না, কিন্তু ততক্ষণে ডিহাইড্রেশন শরীরের ওপর প্রভাব ফেলা শুরু করে দেয়। তাই চিকিৎসকেরা তৃষ্ণার অপেক্ষায় না থেকে সারাদিন নিয়মিত পানি পানের পরামর্শ দিয়েছেন। পানির পাশাপাশি ওরস্যালাইন, ঘোল বা মাঠা, ডাবের পানি এবং লেবুর শরবতের মতো ইলেকট্রোলাইট সমৃদ্ধ তরল পান করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ভারতের আবহাওয়া বিভাগও তীব্র গরমে তরল খাবার বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে।
যেসব খাবার ও অভ্যাস ঘুম বাড়ায়
দুপুরের কড়া রোদের মধ্যে ভারী এবং তৈলাক্ত খাবার খেলে অলসতা আরও বাড়ে। ডা. মানসী নিগম জানান, দুপুরে ভারী খাবার খেলে শরীর সেই খাবার হজম করার জন্য পাকস্থলীতে রক্ত সঞ্চালন বাড়িয়ে দেয় এবং মস্তিষ্ক থেকে রক্ত প্রবাহ কমে যায়, যা ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে তোলে। তাই দুপুরে ফলমূল, দই, শসা, সালাদ ও শাকসবজিযুক্ত হালকা ও পানিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত। অতিরিক্ত ক্যাফেইন, চিনিযুক্ত পানীয় ও চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। দুপুরে অল্প সময়ের জন্য ঘুমানো ক্ষণিকের জন্য চনমনে ভাব আনলেও দীর্ঘ সময় ঘুমালে রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
গরমে সতেজ ও কর্মক্ষম থাকার উপায়
জীবনযাপনে ছোট কিছু পরিবর্তন এনে গরমেও শরীরকে সতেজ রাখা সম্ভব বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা। বিশেষজ্ঞ-অনুমোদিত কিছু পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে- সারাদিন নিয়মিত বিরতিতে পানি ও তরল খাবার পান করা, দুপুরের তীব্র রোদে সরাসরি বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলা, শোবার ঘর ঠান্ডা, অন্ধকার এবং বাতাস চলাচলের উপযোগী রাখা, প্রতিদিন ঘুমানোর একটি নির্দিষ্ট সময় বজায় রাখা, ঘুমানোর আগে স্ক্রিন টাইম (মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার) সীমিত করা, দিনের বেলা হালকা খাবার খাওয়া, শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে অল্প সময়ের জন্য বিশ্রাম নেওয়া, বেশি মানসিক শ্রমের কাজগুলো সকালের ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যে সেরে ফেলা এবং বাইরে যাওয়ার সময় ঢিলেঢালা ও আরামদায়ক পোশাক পরা।
ডা. মানসী নিগম বলেন, ‘গ্রীষ্মকালে একটি ঠান্ডা ও অন্ধকার শোবার ঘর কোনও বিলাসিতা নয়, এটি পর্যাপ্ত বিশ্রামের জন্য একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা।’
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
গরমে সামান্য ক্লান্তি লাগা স্বাভাবিক হলেও, যদি নিয়মিত ঠান্ডা ও হাইড্রেটেড থাকার পরেও দিনের বেলার এই অতিরিক্ত ঘুম ভাব দূর না হয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন যে, অ্যানিমিয়া (রক্তস্বল্পতা), থাইরয়েড সমস্যা, ডায়াবেটিস, কোনও সংক্রমণ কিংবা ঘুমের অন্য কোনও জটিল রোগের লক্ষণও গরমের ক্লান্তির মতো মনে হতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও ঘুম ভাবকে কেবল ‘গরমের কারণে হচ্ছে’ বলে উড়িয়ে না দিয়ে সঠিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সূত্র: এনডিটিভি



