প্যাকেটজাত খাবারে অস্বাস্থ্যকর উপাদান বাড়াচ্ছে রোগের ঝুঁকি
প্যাকেটজাত খাবারে লবণ-চিনি-চর্বি বাড়াচ্ছে রোগের ঝুঁকি

প্যাকেটজাত খাবারে উচ্চমাত্রার চিনি, লবণ ও ট্রান্সফ্যাট উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্থূলতা ও ক্যান্সারের মতো অ-সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বক্তারা বলেছেন, সহজ, স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণ ভিত্তিক ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

কর্মশালার আয়োজন

প্রজ্ঞা (নলেজ ফর প্রগ্রেস) এবং গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহায়তায় ১৮-১৯ মে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনে দুই দিনের সাংবাদিক কর্মশালায় বক্তারা এই আহ্বান জানান। কর্মশালায় প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ার মোট ২৭ জন সাংবাদিক অংশ নেন। কর্মশালার শিরোনাম ছিল 'বাংলাদেশে ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং: গুরুত্ব, অগ্রগতি ও করণীয়'।

অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রভাব

কর্মশালায় বলা হয়, অতি-প্রক্রিয়াজাত প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয় অ-সংক্রামক রোগের অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার মানুষ অ-সংক্রামক রোগে মারা যায়, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ, যার মধ্যে ১৯ শতাংশ অকাল মৃত্যু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এই ব্যাপক মৃত্যুর অন্যতম প্রতিরোধযোগ্য কারণ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জরিপের ফলাফল

বক্তারা উল্লেখ করেন, প্যাকেটজাত খাবার প্রায়ই নিরাপদ বা স্বাস্থ্যকর বলে মনে করা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ২০২৫ সালে ৯৭৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক, কিশোর ও শিশুর ওপর এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৯৭ শতাংশ উত্তরদাতা সপ্তাহে অন্তত একবার প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণ করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৪টি খাদ্য বিভাগের অধীনে ১০৫টি প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পণ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৬৩ শতাংশ পণ্যে উচ্চমাত্রার লবণ রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২০২৩ সালের আরেকটি গবেষণায় দেশের ২৪টি ব্র্যান্ডের নয়টি বিভাগের প্রক্রিয়াজাত প্যাকেটজাত খাবার পরীক্ষা করে দেখা যায়, অধিকাংশ পণ্যে চিনি, লবণ ও অস্বাস্থ্যকর চর্বির মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রস্তাবিত দৈনিক সীমা ছাড়িয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট, চিনি ও লবণের সম্পূর্ণ তথ্য পণ্যের লেবেলে অস্পষ্ট বা অনুপস্থিত ছিল।

ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিংয়ের গুরুত্ব

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিংকে একটি কার্যকর ও 'বেস্ট-বাই' জনস্বাস্থ্য হস্তক্ষেপ হিসেবে সুপারিশ করেছে। বিশ্বব্যাপী ৪৪টি দেশ এফওপিএল চালু করেছে, যার মধ্যে ১০টি দেশে সতর্কীকরণ ভিত্তিক এফওপিএল বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব দেশের প্রমাণ থেকে দেখা যায়, এফওপিএল বাস্তবায়ন ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়িয়েছে এবং উৎপাদকদের পণ্য সংস্কারে উৎসাহিত করেছে।

বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, 'অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার সম্পর্কে ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়াতে ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং চালুর কাজ চলছে। একবার বাস্তবায়িত হলে দেশে অ-সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমবে।'

ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের সেন্টার ফর নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ অ্যান্ড নিউট্রিশনের সহযোগী বিজ্ঞানী আবু আহমেদ শামীম বলেন, 'এফওপিএল ভোক্তাদের অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ক্ষতিকর চর্বি দ্রুত শনাক্ত করতে এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্য পছন্দ করতে সহায়তা করে।'

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার খাদ্য-সম্পর্কিত ঝুঁকি বিষয়ক কর্মসূচি কর্মকর্তা সামিনা ইসরাত বলেন, 'বাংলাদেশে ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং চালু করা খাদ্য-সম্পর্কিত অ-সংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝা মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-প্রস্তাবিত একটি সাশ্রয়ী জনস্বাস্থ্য হস্তক্ষেপ, যা সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসকে উৎসাহিত করে।'

জিএইচএআই-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস বলেন, 'বাংলাদেশে ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং বাস্তবায়িত হলে অ-সংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝা হ্রাস পাবে।'

কর্মশালায় আরও উপস্থিত ছিলেন অ্যান্টি-টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স-এটিএমএর আহ্বায়ক মর্তুজা হায়দার লিটন, সহ-আহ্বায়ক নাদিরা কিরণ এবং প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের। প্রজ্ঞার প্রোগ্রাম অফিসার শবনম মোস্তফা কর্মশালায় উপস্থাপনা করেন।