যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রজন্মের কিশোর-কিশোরীরা তাদের বাবা-মায়ের চেয়ে অনেক কম মদ্যপান করছেন। আপাতদৃষ্টিতে এই মদমুক্ত থাকার প্রবণতাকে ইতিবাচক মনে হলেও, এর পেছনের সব কারণ কিন্তু সুখকর নয়। গবেষকেরা বলছেন, এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনও একটি কারণ নেই। তবে অনেক কিশোরের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, একসঙ্গে গ্লাসে গ্লাস মিলিয়ে ‘চিয়ার্স’ বলার মতো কোনও সঙ্গীই তাদের নেই। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে এ খবর জানা গেছে।
প্রযুক্তি ও মহামারির প্রভাব
প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং করোনা মহামারির ধাক্কায় এখনকার তরুণদের শৈশব অনেকটাই বদলে গেছে। ফলে তারা একরকম বিচ্ছিন্ন ও একাকী হয়ে পড়েছে। জেন জি গবেষক ও ‘দ্য আপ অ্যান্ড আপ’ নিউজের লেখক র্যাচেল জানফাজা বলেন, ‘কোভিডের পর আমাদের সামাজিক মেলামেশার ধরনটাই পুরোপুরি বদলে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। এই দুই শক্তির মেলবন্ধনে আমাদের আড্ডা দেওয়ার ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে।’
গবেষণার তথ্য
মিশিগান ইউনিভার্সিটির ‘মনিটরিং দ্য ফিউচার’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রকল্প গত অর্ধ শতাব্দী ধরে তরুণদের মাদক গ্রহণের প্রবণতা ট্র্যাক করছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে কিশোরদের মদ্যপানের হার কমতে শুরু করে, যা বর্তমানে আরও গতি পেয়েছে।
গবেষণার পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯৭ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এসে যুক্তরাষ্ট্রে বার্ষিক মদ্যপানের হার দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ থেকে কমে ৪১ শতাংশে, দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ থেকে কমে ২৪ শতাংশে এবং অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ১১ শতাংশে নেমে এসেছে।
এমটিএফ-এর প্রধান গবেষক রিচার্ড মিচ বলেন, ‘মদ্যপানসহ সব ধরনের মাদক গ্রহণই মূলত একটি সামাজিক বিষয়।’ তিনি জানান, ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী অষ্টম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে জীবনে কখনোই মদ বা কোনও মাদক ছুঁয়ে না দেখার হার ঐতিহাসিকভাবে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দ্বাদশ শ্রেণির ক্ষেত্রেও এটি রেকর্ডের কাছাকাছি। অর্থাৎ, বাচ্চারা যে মদের বদলে অন্য কোনও মাদকের দিকে ঝুঁকছে, তা নয়। তারা কোনও কিছুই ব্যবহার করছে না। লেখক ডেরেক থম্পসনও একে মাদকের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রবণতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মদ্যপান না করার কারণ
গবেষক জানফাজা তরুণদের মদ্যপান থেকে দূরে থাকার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, মহামারির পর থেকে কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক জীবনে বড় ধাক্কা লেগেছে। তারা তীব্র একাকীত্বে ভুগছে এবং তাদের আড্ডা এখন মূলত অনলাইনেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য ও শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে চাপ এখন তরুণ-তরুণী উভয়ের মধ্যেই প্রবল। বিশেষ করে ওজন কমানোর হুজুগ এবং নিজেদের আকর্ষণীয় দেখানোর সংস্কৃতি এর জন্য দায়ী। এ ছাড়া স্মার্টওয়াচের মতো পরিধেয় প্রযুক্তি ঘুম বা হাঁটার হিসাব রাখে, যা তরুণদের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তৃতীয়ত, জেন জি-র ওপর আর্থিক টানাপোড়েনের প্রভাব পড়েছে তাদের প্রেম-ভালোবাসার সম্পর্কেও। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক তরুণ (৫৩ শতাংশ) এবং তরুণী (৫৪ শতাংশ) ডেটিংয়ের পেছনে মাসে শূন্য ডলার খরচ করে।
জানফাজা আরও বলেন, বর্তমান জেন-জি প্রজন্ম জীবনের সবকিছুতেই কিছুটা ধীরগতির। তারা শুধু মদ্যপানই কম করছে না, বরং তারা শারীরিক সম্পর্কেও কম জড়াচ্ছে এবং ড্রাইভিং লাইসেন্সও দেরিতে নিচ্ছে। মহামারির আগে থেকেই তরুণরা তাকে বলে আসছিল যে, তাদের স্বাধীনতা ও শৈশব যেন কিছুটা বেশি নিয়ন্ত্রিত বা কঠোর নিয়মে বাঁধা।
বাবা-মায়ের করণীয়
এই পরিস্থিতিতে জানফাজাদের পরামর্শ, বাবা-মায়েরা সন্তানদের মদ্যপানে উৎসাহিত না করেও তাদের মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারেন। অভিভাবকদের বুঝতে হবে যে, এমন এক পৃথিবীতে বাস করা কতটা মানসিক চাপের যেখানে সারাক্ষণ কেউ না কেউ নজর রাখছে এবং অনলাইনে সবসময় নিজের সেরা রূপটি প্রকাশ করতে হচ্ছে। তাই সন্তানদের কোনও মাদক ছাড়াই মুখোমুখি বসে আড্ডা দেওয়া বা মেলামেশা করতে উৎসাহিত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।



