চিকিৎসকদের মতে, হাম সংক্রমণের পর তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল থাকে। হাম হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে যায়, ফলে শিশু সহজেই নিউমোনিয়া, ডায়রিয়ার মতো রোগে আক্রান্ত হয়। পুষ্টির ঘাটতি উদ্বেগের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
হাম-পরবর্তী জটিলতা বাড়ছে
গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, হামের সংক্রমণ কিছুটা কমেছে, তবে হাম-পরবর্তী জটিলতা নিয়ে গোল বাঁধছে। উদ্বেগ বাড়ছে হাম-পরবর্তী জটিলতায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা নিয়ে।
কেরানীগঞ্জের সাবেরা বেগমের আট মাসের শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছিল। তিনি বলেন, 'হাম ছাড়লেও যম ছাড়ছে না, মৃত্যু ঘুরছে শিশুদের পিছু পিছু।' হাম থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি গিয়ে আবার ফিরে এসেছে অনেকে—কেউ নিউমোনিয়া নিয়ে, কেউ ডায়রিয়া নিয়ে ভুগতে ভুগতে মারা গেছে বাবা–মায়ের চোখের সামনে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো ওষুধই কথা শুনছে না।
পুষ্টির ঘাটতি ও টিকার অসম্পূর্ণতা
পুষ্টিবিদেরা বলছেন, দেশের ৬৫% শিশু ন্যূনতম প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার পায় না। অপুষ্টি হামে আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা অনেক বাড়িয়ে দেয়। টিকাদান ও জনস্বাস্থ্য–বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, 'অপুষ্টি শিশুদের রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। নিউমোনিয়া সবচেয়ে সাধারণ জটিলতা, পাশাপাশি ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণও দেখা যায়। একবার কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি, এমনকি আজীবনও হতে পারে।'
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, টিকা প্রদান স্বাভাবিক থাকলেও কমপক্ষে ১৮ শতাংশ শিশু নিয়মিত টিকাদান থেকে বাদ পড়ে যায়। এ কারণে এই শিশুরা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে থাকে। সময়মতো ভিটামিন এ ক্যাপসুল না খাওয়া শিশুও ঝুঁকির তালিকায় আছে।
মাতৃত্বকালীন ছুটির বৈষম্য
কর্মজীবী মায়েদের শিশুরা কি বুকের দুধ পাচ্ছে? বাংলাদেশে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে বৈষম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রম, লিঙ্গ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। সরকারি কর্মচারীরা সাধারণত ছয় মাসের বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি পান, কিন্তু অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আইন অনুযায়ী সুবিধা পুরোপুরি দেওয়া হয় না। ফলে একজন কারখানাকর্মী মায়ের পক্ষে টানা দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে পর্যাপ্ত বুকের দুধ খাওয়ানো কঠিন।
নোয়াখালীতে জরিপের ফলাফল
সম্প্রতি নোয়াখালীভিত্তিক একটি মানবিক সংগঠন 'প্রাণ' হাম পরিস্থিতি বোঝার জন্য একটি জরিপ করে। জরিপে দেখা যায়, মাত্র ১৮ দশমিক ২ শতাংশ শিশু হাম টিকার উভয় ডোজ গ্রহণ করেছিল। ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি এবং ৩০ দশমিক ৩ শতাংশ শুধু প্রথম ডোজ পেয়েছিল। ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে ৭৩ শতাংশ হাম পজিটিভ পাওয়া গেছে। টিকা না নেওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ছিল টিকা দেওয়ার সময় সম্পর্কে অজ্ঞতা (২৭%), টিকার সময় শিশুর অসুস্থতা (২৪%) এবং টিকাকেন্দ্রের দূরত্ব (১৫%)।
প্রতিকার ও করণীয়
টিকার সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টিকর খাবারের জোগান ঠিক রাখতে হবে। কোনো শিশু যদি খিদে নিয়ে ঘুমায়, তাহলে মৃত্যু থেকেই যাবে। হাম থেকে মুক্ত হলে প্রাণ যাবে নিউমোনিয়ায়, ডায়রিয়াসহ নানা ব্যাধিতে। কমিউনিটিভিত্তিক লক্ষ্যকেন্দ্রিক প্রচার কার্যক্রম, স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি পরিদর্শন জোরদার করা এবং পুরুষ অভিভাবকদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতা দূর করা জরুরি।



