করোনা মহামারির পর বাংলাদেশ আবারও এক জনস্বাস্থ্যগত মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য একটি সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে শিশুরা। হাতে ক্যানুলা, নাকে নল নিয়ে হাসপাতালগুলোতে লড়ছে হাজারো শিশু। অক্সিজেন ও আইসিইউর খোঁজে গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে নগরে ছুটছে অসহায় পিতা-মাতা। ধার করে, সম্পত্তি বন্ধক রেখে চিকিৎসা করাতে করাতে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে পরিবার। তবু সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাচ্ছে আদরের সন্তান।
হাম প্রতিরোধযোগ্য, তবু সংক্রমণ সর্বোচ্চ
করোনা মহামারির সঙ্গে হামের বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, হাম সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। করোনার শুরুতে কোনো টিকা না থাকলেও হামের পরীক্ষিত টিকা রয়েছে। নিয়মিত টিকা দিলে এত বড় সংক্রমণ হতো না। বাংলাদেশে হাম প্রায় নির্মূলের পর্যায়ে ছিল। অতীতেও প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল, তবে এবার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। সরকারি হিসেবে ১৫ মার্চ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট মৃত্যু ৪৫৯ জন, আক্রান্ত ৬৫ হাজার ৬১৩ জন।
টিকাদান ব্যবস্থায় ব্যর্থতা
অভিযোগ উঠেছে, বিগত অন্তর্বর্তী সরকার টিকাদান ব্যবস্থার অপারেশনাল কাঠামো পরিবর্তন করে প্রস্তুতি নিতে ব্যর্থ হয়। অর্থায়ন, সরবরাহ ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। ইউনিসেফের মাধ্যমে দ্রুত টিকা কেনার পুরোনো পদ্ধতি বদলে জটিল নতুন ক্রয়প্রক্রিয়া চালু করায় টিকা সংগ্রহে বড় বিলম্ব হয়। টিকাদানের আওতা কমে যাওয়ার বিষয়ে ইউনিসেফের সতর্কবার্তা আমলে নেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালে বিশেষ ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এসব শিশুদের হার্ড ইমিউনিটি দুর্বল করেছে।
বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জরুরি উদ্যোগ নিলেও তা যথেষ্ট কি না, সংশয় রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দাবি করেছে, ১ কোটি ৮২ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৫ জন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে (লক্ষ্যমাত্রার ১০১ শতাংশ)। কিন্তু ইউনিসেফের আরসিএম জরিপ বলছে, শহরে ৩০-৪০ শতাংশ ও গ্রামে ১৫ শতাংশ শিশু টিকা পায়নি। প্রচারের ঘাটতি ও টিকা নিয়ে অপপ্রচারের কারণে মানুষের মধ্যে দ্বিধা রয়েছে।
চিকিৎসাসংকট ও তথ্য গোপন
আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসায় সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মহামারি ছড়িয়ে পড়ার দুই মাসের বেশি সময় পরও চিকিৎসা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে হামের যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। শনাক্তকরণ কিট, অক্সিজেন, আইসিইউ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট প্রকট। অনেক শিশুকে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে কয়েক দিন চিকিৎসার পর মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকায় আনা হয়। দীর্ঘ ভ্রমণ তাদের অবস্থা আরও জটিল করে। ঢাকার হাসপাতালগুলো রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। শয্যা না পেয়ে মায়েরা হাসপাতালের মেঝেতে থাকছেন। সরকারি হাসপাতাল থেকে শিশুদের ফিরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আইসিইউতে সিরিয়াল পাওয়া যায় না। ফলে মৃত্যুর হার বাড়ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা হামের প্রাদুর্ভাবকে ‘স্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার তাগিদ দিলেও সরকার তা অস্বীকার করছে। হামে মৃত্যুসংশ্লিষ্ট তথ্যও প্রকাশ করছে না। মৃত শিশুদের বয়স বিভাজন, হাসপাতালে আসা ও মৃত্যুর সময়, অন্য রোগ, অক্সিজেনপ্রাপ্তি, চিকিৎসার ধরন—এসব তথ্য শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে ভূমিকা রাখত। হামে মৃত শিশুদের একটি বড় অংশ নিম্ন আয়ের হওয়ার কারণে এই অবহেলা কি না, প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক অভিভাবকত্বহীনতা
প্রধান বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও এত বড় জনস্বাস্থ্যগত বিপর্যয়ের ছাপ নেই। বিরোধী দলের কাজ হতো হাম প্রতিরোধে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা, ঘাটতি তুলে ধরা, পরামর্শ ও দাবি উত্থাপন করা। কিন্তু সংসদে টুকটাক সমালোচনা ছাড়া সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য বা কর্মসূচি চোখে পড়েনি। হামে আক্রান্ত শিশুরা চিকিৎসাসংকটের পাশাপাশি রাজনৈতিক অভিভাবকত্বহীনতায়ও ভুগছে।
জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজন
এভাবে চলতে পারে না। সরকারকে অবিলম্বে স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা জারি করে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে হামের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে স্থানীয় পর্যায়ে আইসোলেশনের আওতায় এনে চিকিৎসা দিলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসবে। করোনাকালের মতো বিনা মূল্যে অক্সিজেন সরবরাহ করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সংকটে বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ সরকারি খরচে ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। হামে আক্রান্ত দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। দায়ীদের চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অবহেলা না ঘটে।
বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে প্রাণঘাতী ও ব্যয়বহুল রোগের ক্ষেত্রে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে স্বাস্থ্যসেবা সরকারিভাবে ক্রয় করে দরিদ্র নাগরিকদের উন্নত চিকিৎসা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দরিদ্র পরিবারের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা সহায়তা ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ভর্তুকির অঙ্গীকারও ছিল। এখনই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সময়। হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা ও সহায়তার মধ্য দিয়েই তা শুরু হতে পারে। শুধু টাকার অভাবে বেসরকারি খাতের আইসিইউ ও অক্সিজেনের সব সুবিধা অব্যবহৃত রেখে ফুলের মতো শিশুদের ঝরে যেতে দেওয়া যায় না।
কল্লোল মোস্তফা: লেখক ও গবেষক, নির্বাহী সম্পাদক, সর্বজনকথা



