কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ উচ্চ রক্তচাপ, সতর্ক থাকুন
কিডনি রোগের প্রাথমিক লক্ষণ উচ্চ রক্তচাপ

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন শরীরে নীরবে বাসা বাঁধা কিডনি রোগের একটি প্রাথমিক সতর্কবার্তা হতে পারে। কিডনির অসুখ কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই খুব গোপনে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তাই এই দুইয়ের মধ্যকার সম্পর্ক বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগের সম্পর্ক

সাধারণত উচ্চ রক্তচাপকে আমরা হৃদরোগ, মানসিক চাপ বা অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলি। অনেকেই রক্তচাপের রিডিং দেখে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ খান এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যান। তবে রক্তচাপের এই ওঠানামা সাধারণ কোনো সমস্যা নাও হতে পারে। এটি হতে পারে কিডনির ভেতরে তৈরি হওয়া কোনো জটিল সমস্যার আগাম সংকেত। সময়মতো রক্তচাপের এ পরিবর্তনের দিকে নজর দিলে কিডনির বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আগেই তা শনাক্ত করা সম্ভব।

চিকিৎসকরা বলেন, উচ্চ রক্তচাপকে প্রায়শই একটি সাধারণ সমস্যা হিসেবে অবহেলা করা হয়, যা আসলে কিডনি নষ্ট হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করতে পারে। অনেকেই জানেন যে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু খুব কম মানুষই বোঝেন যে কিডনির রোগ নিজেই উচ্চ রক্তচাপের কারণ হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিশু, কিশোর এবং তরুণদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপই হলো কিডনি নষ্ট হওয়ার প্রথম এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য লক্ষণ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কিডনি যেভাবে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে

শরীর থেকে শুধু বর্জ্য পদার্থ বের করে দেওয়াই কিডনির একমাত্র কাজ নয়। সুস্থ রক্তচাপ বজায় রাখতেও এটি প্রধান ভূমিকা পালন করে। সুস্থ কিডনি শরীরে তরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং এমন কিছু হরমোন নিঃসরণ করে যা রক্তচাপের ভারসাম্য বজায় রাখে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চিকিৎসকরা বলেন, কিডনি হলো শরীরের প্রধান রক্তচাপ নিয়ন্ত্রক। সুস্থ থাকলে এটি শরীরের তরলের নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখে এবং নির্দিষ্ট হরমোন নিঃসরণের মাধ্যমে রক্তচাপকে স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু ডায়াবেটিস, সংক্রমণ, গ্লোমেরুলার ডিজিজ বা বংশগত কোনো রোগের কারণে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে রক্তপ্রবাহ কমে যায়। কিডনি তখন এ রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়াকে শরীরের একটি বড় সংকট হিসেবে ধরে নেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় কিডনি থেকে হরমোন (বিশেষ করে 'রেনিন') নিঃসৃত হতে শুরু করে, যা রক্তনালীগুলোকে সংকুচিত করে এবং শরীরে লবণ ও পানি ধরে রাখতে বাধ্য করে। এ প্রক্রিয়ার ফলে রক্তচাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে কিডনি রোগের অন্য কোনো লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে।

কখন উচ্চ রক্তচাপ বিপদের সংকেত?

সব উচ্চ রক্তচাপই কিডনি রোগের কারণে হয় না, তবে কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন:

  • কম বয়সে উচ্চ রক্তচাপ: ৩০ বছরের কম বয়সি কোনো ব্যক্তির যদি নতুন করে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা দেখা দেয় এবং এর পেছনে কোনো স্পষ্ট কারণ না থাকে, তবে তা কিডনির অন্তর্নিহিত সমস্যার সংকেত হতে পারে।
  • প্রতিরোধী বা রেজিস্ট্যান্ট উচ্চ রক্তচাপ: যদি তিন বা তার বেশি ওষুধ খাওয়ার পরও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে চিকিৎসকেরা সাধারণত পরীক্ষা করে দেখেন যে এর পেছনে কিডনির কোনো রোগ দায়ী কি না।
  • হঠাৎ রক্তচাপের অবনতি: মধ্যবয়সি বা প্রবীণদের ক্ষেত্রে আগে নিয়ন্ত্রণে থাকা রক্তচাপ যদি হঠাৎ করে অনেক বেড়ে যায়, তবে বুঝতে হবে শরীর রক্তচাপের মাধ্যমে কিডনির নীরব সংকটের কথা জানান দিচ্ছে।

যেসব লক্ষণ এড়িয়ে যাওয়া যাবে না

কিডনি রোগকে প্রায়ই 'নীরব ঘাতক' বলা হয় কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীরা কোনো উপসর্গই টের পান না। এ কারণে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি। তবে রোগটি বাড়তে থাকলে কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে:

  • পায়ে পানি আসা বা ফুলে যাওয়া
  • অস্বাভাবিক ক্লান্তি ও শ্বাসকষ্ট
  • ঘনঘন মাথাব্যথা ও ঘুমের ব্যাঘাত
  • ক্ষুধা কমে যাওয়া এবং প্রস্রাবের অভ্যাসে পরিবর্তন
  • প্রস্রাবে ফেনা হওয়া, প্রস্রাবের রং পরিবর্তন বা রাতে ঘনঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া

ওষুধ খাওয়ার পরও যদি রক্তচাপ ক্রমাগত বেশি থাকে, তবে তাকে অবহেলা না করে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত।

কিডনি রোগ নির্ণয়ের প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা

রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে চিকিৎসকেরা কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য কিছু সহজ টেস্টের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যেমন—কিডনি ফাংশন টেস্ট বা রক্তে ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা পরীক্ষা, যার মাধ্যমে জানা যায় কিডনি কতটা ভালো কাজ করছে। এছাড়া প্রস্রাবের রুটিন টেস্টের মাধ্যমে প্রস্রাবে প্রোটিন বা রক্ত যাচ্ছে কি না তা ধরা পড়ে, যা কিডনি ড্যামেজের লক্ষণ। পাশাপাশি কিডনি ও মূত্রথলির একটি আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে কোনো কাঠামোগত ত্রুটি আছে কি না তা সহজেই জানা যায়।

জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এনে কিডনি সুরক্ষার উপায়

জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস কিডনির সুস্থতায় বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। খাবারে লবণের পরিমাণ কমালে শরীরে অতিরিক্ত তরল জমতে পারে না এবং কিডনির ওপর চাপ কমে। এছাড়া পর্যাপ্ত পানি পান করা, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যত্রতত্র ওষুধ (বিশেষ করে ব্যথানাশক) খাওয়া এবং ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করলে কিডনি সচল রাখা সম্ভব।

নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা কেবল হার্ট ভালো রাখার জন্যই নয়, এটি কিডনি রোগকে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করার এবং তার ক্ষতি ধীর করার একটি অন্যতম উপায়।