দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সরকার ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বিশেষ হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ বস্তি এলাকায় সচেতনতামূলক প্রচার, টিকাবঞ্চিত শিশু চিহ্নিতকরণ এবং কমিউনিটি মবিলাইজেশনের কাজ করছে স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপিং সায়েন্স অ্যান্ড হেলথ ইনিশিয়েটিভ (আইদেশি)।
টিকাদান কর্মসূচির পটভূমি
সম্প্রতি দেশে হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সরকার দেশব্যাপী শিশুদের এমআর টিকার আওতায় আনতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। এই কার্যক্রম সফল করতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরামর্শে রাজধানীর কয়েকটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ শুরু করেছে আইদেশি।
কর্ম এলাকা ও অগ্রাধিকার
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৭, ৮ ও ১৭ নম্বর ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জোন-৩–এর ছয়টি ওয়ার্ডে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলছে। দক্ষিণের লালবাগ, হাজারীবাগ ও কামরাঙ্গীরচরের ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যেখানে হামের সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বলে মনে করা হচ্ছে।
আইদেশি জানিয়েছে, ঢাকা উত্তরের ১৫টি বস্তিতে তাদের কর্মীরা নিয়মিত কাজ করছেন। এ ছাড়া দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১৫০টি গলি ঘুরে ১০ হাজারের বেশি বাড়ি পরিদর্শন করে টিকা না পাওয়া শিশুদের শনাক্ত করা হয়েছে। পরে তাদের অভিভাবকদের টিকার প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে সিটি করপোরেশনের সহায়তায় শিশুদের টিকার আওতায় আনা হচ্ছে।
প্রচার ও জনসচেতনতা কার্যক্রম
প্রচার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে আইদেশির কর্মীরা গলিতে গলিতে মাইকিং করছেন। বিশেষভাবে তৈরি অডিও বার্তা, যা ইপিআই ও ইউনিসেফের নির্দেশনা অনুসারে প্রস্তুত, বিভিন্ন এলাকায় প্রচার করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রায় ১০ হাজার লিফলেট বিতরণ, পোস্টার ও ব্যানার টানানোর কাজও করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও মসজিদের ইমামদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জনসচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। যেসব এলাকায় টিকা গ্রহণের হার কম, সেগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বাড়তি প্রচার চালানো হচ্ছে। টিকাকেন্দ্রগুলোতেও আইদেশির নারী স্বেচ্ছাসেবকেরা শিশু ও অভিভাবকদের সহায়তা করছেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিকা না পাওয়া শিশুদের কেন্দ্রে নিয়ে আসার কাজও করছেন তাঁরা।
বিশেষ ক্যাম্পেইন ও পর্যবেক্ষণ
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের পরামর্শে কিছু এলাকায় বিশেষ মপ-আপ ক্যাম্পেইন ও ইভিনিং সেশন পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব কার্যক্রমেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে আইদেশি।
প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসকেরা ডব্লিউএইচওর বিশেষ সার্ভিল্যান্স টুল ব্যবহার করে টিকাদান কার্যক্রমের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের কাজ করছেন। এর মাধ্যমে কোন এলাকায় কত শিশু টিকার বাইরে রয়ে গেছে, তা কেন্দ্রীয়ভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে।
পরিদর্শন ও সমন্বয়
সম্প্রতি স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী ফিরদৌসী কাদরী এবং আইদেশির প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ডা. মো. রফিকুর রহমান মিরপুরের কয়েকটি বস্তি ও টিকাকেন্দ্র পরিদর্শন করেন। তাঁরা শিশুদের মায়েদের সঙ্গে কথা বলেন এবং টিকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। এক উঠান বৈঠকে ফিরদৌসী কাদরী অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, সময়মতো টিকা গ্রহণই শিশুদের হামের মতো প্রাণঘাতী রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।
আইদেশি জানিয়েছে, ইপিআই, ইউনিসেফ, ডব্লিউএইচও ও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ের মাধ্যমে তারা কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়—অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও কমিউনিটি নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া হামের ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয়।



