উচ্চ রক্তচাপের জটিলতা: মস্তিষ্ক থেকে কিডনি, জানুন সবকিছু
উচ্চ রক্তচাপের জটিলতা: মস্তিষ্ক থেকে কিডনি

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক সাধারণ দৃশ্য কল্পনা করুন। অজ্ঞান অবস্থায় এক রোগীকে নিয়ে আসেন তাঁর স্বজনরা। দেখা যায়, রোগীর রক্তচাপ ২২০/১১০, অথচ কেউই জানতেন না তাঁর উচ্চ রক্তচাপ আছে! সিটি স্ক্যানে ধরা পড়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ। রক্তচাপ বেড়ে মস্তিষ্কের রক্তনালি ছিঁড়ে এই অবস্থা। ওই দিনের আগে তিনি কখনো অসুস্থ বোধ করেননি, কখনো নিজের রক্তচাপ মাপার প্রয়োজন বোধ করেননি।

দেশের হাসপাতালগুলোতে এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। অথচ একটু সচেতন হলে এই মারাত্মক সমস্যা এড়ানো যেত। বহু মানুষ নিজের যত্ন নেন না, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা সম্পর্কে জানেন না। অনেকে জানলেও মেনে চলেন না। সুস্থ অবস্থায় রক্তচাপ বা রক্তের সুগার মাপার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন না।

উচ্চ রক্তচাপের জটিলতা

হৃৎপিণ্ডের ওপর প্রভাব

রক্তচাপ বেশি থাকলে হৃৎপিণ্ডের কাজের চাপ বাড়ে। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কাজ করতে করতে হৃৎপিণ্ডের বাঁ পাশের নিচের অংশ (ভেন্ট্রিকল) বড় হতে থাকে। একসময় হৃৎপিণ্ডের কর্মক্ষমতা কমে যায়, যাকে বলা হয় হার্ট ফেলিওর। এই অবস্থায় ফুসফুসেও পানি জমে। হৃৎপিণ্ডের রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যকারিতাও নষ্ট হয়, বাড়ে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মস্তিষ্কে নেতিবাচক প্রভাব

শুরুতেই মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কথা বলা হয়েছে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলে হেমোরেজিক স্ট্রোক। আরেক ধরনের স্ট্রোক হলো ইশকেমিক স্ট্রোক, যেখানে মস্তিষ্কের রক্তনালির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। উচ্চ রক্তচাপের কারণে দুই ধরনের স্ট্রোকের ঝুঁকিই বাড়ে। এ ছাড়া মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়, কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়, হতে পারে স্মৃতিভ্রম।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কিডনি ও চোখের জটিলতা

রক্তচাপ বেশি থাকলে কিডনির রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ছাঁকন প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটে, কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের অন্যতম কারণ অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ। চোখের রক্তনালিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দৃষ্টিশক্তি কমে যেতে পারে, এমনকি অন্ধত্বও হতে পারে। নাক থেকে রক্ত পড়ারও অন্যতম কারণ রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া।

অন্যান্য জটিলতা

দেহের ভেতরের কোনো রক্তনালির অংশ ফুলে যেতে পারে, মারাত্মক রক্তক্ষরণ হতে পারে। দাম্পত্য জীবনের অন্তরঙ্গতাও ব্যাহত হতে পারে, পুরুষ ও নারী উভয়ের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব আছে। অন্তঃসত্ত্বা নারীর উচ্চ রক্তচাপ থাকলে প্রিএকলাম্পসিয়া ও একলাম্পসিয়ার ঝুঁকি থাকে, গর্ভের শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে, অকাল প্রসব হতে পারে, মা ও শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা

এসব জটিলতা এড়াতে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শমাফিক ওষুধ সেবন করতে হবে, নির্দিষ্ট সময় পরপর রক্তচাপ মাপতে হবে। কোনো শারীরিক সমস্যা না থাকলেও ছয় মাস অন্তর রক্তচাপ মাপা উচিত। যেকোনো বয়সেই উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে, ১৮ বছর বয়সের পর থেকে অনেকেই আক্রান্ত হন। তাই ১৮ বছর বয়স পেরোলেই নিজের রক্তচাপ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। বাসায় ভালো মানের রক্তচাপ মাপার যন্ত্র থাকলে পরিবারের সবার রক্তচাপ মাপা সহজ হয়।

স্বাস্থ্যকর জীবনধারা

শৈশবেই সুস্থ জীবনধারা গড়ে ওঠে, তবে যেকোনো বয়সে শুরু করা যায়। খাদ্যাভ্যাসে স্বাস্থ্যকর তেল বাছাই করুন, চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলুন, ফাস্টফুড না খাওয়াই ভালো। বেশি করে উদ্ভিজ্জ খাবার খান, লবণ কম খান, চানাচুর, চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডুলস, সস, কেচাপ, কাসুন্দি প্রভৃতি এড়িয়ে চলুন। অ্যালকোহল ও তামাকজাত পণ্য বর্জন করুন।

প্রতিদিন শরীরচর্চা করুন, সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি ব্যায়াম বা ৭৫ মিনিট ভারী ব্যায়াম, এবং সপ্তাহে অন্তত দুই দিন পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করুন। রাতে ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমান, মানসিক চাপ কমান, জীবনদর্শন সহজ রাখুন। প্রকৃতির মাঝে সময় কাটান, বারান্দায় বা ছাদবাগান করতে পারেন, পোষা প্রাণী বা পথের প্রাণীর যত্ন নিন।