হামে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায় অভিভাবকদের আর্থিক সংকট: সুনামগঞ্জের পান্নার কাহিনী
হামে শিশুর চিকিৎসায় অভিভাবকদের আর্থিক সংকট

হামে আক্রান্ত শিশুর চিকিৎসায় অভিভাবকদের আর্থিক সংকট: সুনামগঞ্জের পান্নার কাহিনী

‘হাসপাতালে সুই, ক্যানুরা, স্যালাইন, ঔষধ—সবই নিজেদের টাকায় কিনে দিতে হয়। কত টাকা যে গেছে, এখন হিসাবও করতে পারছি না। আমরা যে এখন বাড়ি যাব, সেই টাকাও আমাদের কাছে নাই। ধার দেনা করে বাচ্চার চিকিৎসা করাচ্ছি। আমার নাকের সোনার ফুলটাও বেচে দিয়েছি বাচ্চার চিকিৎসার জন্যে...’—কথাগুলো বলছিলেন সিলেট সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকায় চিকিৎসা নিতে আসা ৯ মাস বয়সি শিশু নাফির মা পান্না আক্তার। রোববার (১৯ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শ্যামলী শিশু হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে কথা হয় পান্নার সঙ্গে। পান্নার স্বামী কৃষিকাজ করেন। বাচ্চা নিয়ে হাসপাতালে থাকার কারণে তার আয় রোজগারও বন্ধ হয়ে আছে। তিনি অনুরোধ করে বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে আমাদের যদি বেড ভাড়াটা মাফ দিত’ কিংবা কোথাও থেকে কোনো আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া যাবে কি না, বারবার সে কথাই জানতে চাইছিলেন পান্না।

চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসার কষ্টকর যাত্রা

পান্না বলেন, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে আমরা ২০ হাজার টাকায় অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ঢাকায় আসি। শিশু হাসপাতালে আসার পর তারা বলেন, সিট নাই, রোগী ভর্তি নেওয়া যাবে না। তারপর ঢাকা মেডিক্যালে গেছি সেখানেও সিট নাই, আমরা এসেছি মার্চ মাসের ৭ তারিখে ঢাকায়। ঢাকা শহরে আমাদের কোনো আত্মীয় নেই, খাবারটাও আমাদের কিনে খেতে হচ্ছে। বাচ্চার একটার পর একটা অসুখ ধরছে। নিউমোনিয়ার চিকিৎসা করাতে এসে হামে আক্রান্ত হয়। এখন বাচ্চার চুলকানি ধরেছে। আমরা ধার-দেনা করে বাচ্চার চিকিৎসা করাচ্ছি। এখন হাসপাতালে সব বিল কীভাবে যে শোধ করে বাড়ি যাব—সেই চিন্তাই করছি...।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যান্য অভিভাবকদেরও একই অবস্থা

এই অবস্থা কেবল নাফির একার নয়; বিভিন্ন হাসপাতালে একাধিক অভিভাবক জানান চিকিৎসা ব্যয়ের কথা। বিষয়টি নিয়ে কথা হয় ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. মাহবুবুল হকের সঙ্গে। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমাদের ৭০০ বেডের মধ্যে ২৫০ বেড বিনা মূল্যের। সাধারণ বেশকিছু পরীক্ষানিরীক্ষা ফ্রিতে হয়ে থাকে। আর শিশু ও মায়ের খাবার ফ্রি হসপিটাল থেকে দেওয়া হয়। রেয়ার মেডিসিন না হলে অ্যান্টিবায়োটিকসহ সাধারণ ওষুধ ফ্রিতে পেয়ে থাকে। অনেক সময় ৫০ ভাগ হসপিটাল দেয়. ৫০ ভাগ রোগীর অভিভাবক দেয়। আইসিইউর দুইটা বেড ফ্রি আছে আর হাম ওয়ার্ডে চারটা বেড বিনা মূল্যে আছে। আইসিইউতে বেড ভাড়া ১ হাজার টাকা, আর ওয়ার্ডে ৭০০ টাকা।’ দরিদ্র অভিভাবক পান্নার বিষয়টি পরিচালককে জানালে তিনি তাদের দরিদ্র তহবিল থেকে পান্নার বাচ্চার চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে সাহায্য করতে পারবেন বলে আশ্বস্ত করেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হামে শিশু মৃত্যুর উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রবিবার বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত হামে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ১৮১ জন। সব মিলে হাম ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ২১৭ জনের। ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে ৩ হাজার ৪৪৩ জন। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা ২৩ হাজার ৬০৬ জন। এ পর্যন্ত হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১৫ হাজার ৩২৬ জন এবং হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে ১২ হাজার ৩৯৬ জন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত ও সমাধানের পথ

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান—আইইডিসিআর এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা বলেছি—উপজেলা থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। প্রাথমিকভাবে যেসব এলাকায় সংক্রমণ বেশি আছে, সেখানে টিকা দেওয়া হচ্ছে। গণটিকা শুরু হলে—সেটা বেশি কার্যকর হবে। পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে—যাদের জ্বর আছে, তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনে রাখতে হবে, শিশুর মা’কেসহ। এ সময় শিশুর বাবা-মাকে আর্থিক সাপোর্ট দিতে হবে। কারণ কাজে যেতে না পারায় তাদের আয় বন্ধ। ফলে বাচ্চাকে তারা খাওয়াতে পারবে না, তখন শিশুরা না খেয়ে মারা যাবে। এটা স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ না, এখানে সমাজকল্যাণ বিভাগকে যুক্ত করতে হবে।’ অর্থাৎ যারা ঝুঁকিপূর্ণ শিশু তাদের চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে, জটিল না হলেও হাসপাতালে এনে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এতে তাদের কাছ থেকে অন্যদের মধ্যে হাম সংক্রমিত হবে না বা ছড়াবে না। শহরে জ্বর আসা শিশুদের নগর হাসপাতালে এনে আইসোলেশনে রাখতে হবে। এসব করতে পারলে দেখা যাবে হামের সংক্রমণ এক মাসের মধ্যে কমে গেছে।