কুমিল্লায় হামে আক্রান্ত শিশুর মৃত্যু: হাসপাতালে শয্যা সংকটে মেঝে-করিডোরে চিকিৎসা
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ৮ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর এই হাসপাতালে প্রথম মৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে শিশু বিভাগের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড-২-এ শিশুটির মৃত্যু হয়, যার নাম মোহাম্মদ রায়হান। সে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে ছিল।
শয্যা সংকটে হাসপাতালের করুণ অবস্থা
হাসপাতালে শয্যা সংকটের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হামে আক্রান্ত ও উপসর্গে ভর্তি হওয়া শিশুদের চিকিৎসা মেঝে, করিডোর এমনকি সিঁড়ির সামনেও চলছে। শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মিয়া মনজুর আহমেদ নিশ্চিত করেছেন যে, গত ১৮ মার্চ থেকে এখানে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে রোগী ভর্তি শুরু হয়। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট ৩১২ জন শিশু ভর্তি হয়েছে, যাদের বয়স ৪ মাস থেকে ১০ বছরের মধ্যে।
এই শিশুদের মধ্যে ২১৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে, চারজনকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে, এবং একজন মারা গেছে। বর্তমানে ৯৪ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে, যাদের হাসপাতালের নিচতলা ও দ্বিতীয় তলায় দুটি পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। অন্য রোগে আক্রান্ত শিশুদের হামে আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি শিশুদের সংস্পর্শে আসতে দেওয়া হচ্ছে না, তবে শয্যা সংকটের কারণে চিকিৎসা পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মৃত শিশুটির চিকিৎসা ইতিহাস ও অবস্থা
হাসপাতালের শিশু বিভাগের চিকিৎসক আবু হানিফ জানিয়েছেন, ৮ মাস বয়সী শিশুটি এর আগেও নিউমোনিয়া এবং ফুসফুসজনিত সমস্যা নিয়ে শিশু বিভাগে ভর্তি ছিল। মঙ্গলবার হামের উপসর্গ জ্বর, কাশি ও র্যাশ নিয়ে ভর্তি হওয়ার সময়ই তার অবস্থা খারাপ ছিল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও শিশুটি বৃহস্পতিবার সকালে মারা যায়।
চিকিৎসকরা উল্লেখ করেছেন, উপসর্গ থেকে হামে আক্রান্তের বিষয়টি বোঝা গেছে, কিন্তু পরীক্ষা বা নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়নি। মৃত্যুর পর স্বজনেরা মরদেহ বাড়িতে নিয়ে গেছেন। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হামের উপসর্গ নিয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, তবে তারা কেউ কুমিল্লায় মারা যায়নি; তাদের ঢাকা স্থানান্তর করা হলে সেখানে তারা মারা যায়। কুমিল্লায় এ হিসাবে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রথম মৃত্যু হলো ওই ৮ মাস বয়সী শিশুটির।
হামের প্রাদুর্ভাব ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ
এই ঘটনা দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের ভয়াবহতা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাগুলোকে উন্মোচিত করেছে। হাসপাতালে শয্যা সংকট, পর্যাপ্ত আইসোলেশন সুবিধার অভাব, এবং দ্রুত রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থা না থাকা শিশুদের চিকিৎসায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, হামের মতো সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, বিশেষ করে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ এখন অতিরিক্ত শয্যা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের জন্য জরুরি সহায়তা চেয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়ানো যায় এবং শিশুদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়।



