বরিশালে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে স্থানীয় সরকারের সমন্বয় জরুরি: গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা
বরিশালে স্বাস্থ্যসেবায় স্থানীয় সরকারের সমন্বয় জরুরি

বরিশালে স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে স্থানীয় সরকারের সমন্বয় জরুরি

স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করা অপরিহার্য। কারণ, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এই দুটি প্রতিষ্ঠানই সরাসরি জনগণের সঙ্গে কাজ করে। তাই পারস্পরিক সমন্বয় থাকলে তারা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে। এর মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনআস্থা অর্জন করা সম্ভব হবে। ‘বরিশালের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্থানীয় সরকারের সমন্বয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ কথা বলেন। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় নগরের বান্দ রোডের হোটেল গ্রান্ড পার্কের মিলনায়তনে এই বৈঠকের আয়োজন করে প্রথম আলো ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল।

বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ

এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান (শিরীন), বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল এবং বরিশালের সিভিল সার্জন এস এম মনজুর-এ-এলাহী। সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা অংশ নেন।

জলবায়ু ঝুঁকি ও স্বাস্থ্যসেবার চ্যালেঞ্জ

সংলাপে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকির শীর্ষে থাকা দেশগুলোর একটি। বরিশাল বিভাগ দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপ্রবণ অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। নদ-নদীবেষ্টিত এই বিভাগে যোগাযোগব্যবস্থা এখনো দুর্গম। এর ওপর ঘন ঘন ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে এ এলাকা সংক্রমণজনিত রোগের হটস্পটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ডেঙ্গু, ডায়রিয়া, হামসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব এবং মৃত্যুঝুঁকি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। লবণাক্ততার কারণে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যও হুমকির মুখে পড়েছে। সেই তুলনায় এই বিভাগে চিকিৎসাব্যবস্থা অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অপ্রতুল। চিকিৎসক, নার্স, অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি এবং অব্যবস্থাপনায় দরিদ্রপ্রবণ এই অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা কার্যত ধুঁকছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে জনপ্রতিনিধিদের সচেতন ও আন্তরিক ভূমিকার কোনো বিকল্প নেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থানীয় সরকারের ভূমিকা ও দায়িত্ব

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান বলেন, স্বাস্থ্য খাত দেশের সবচেয়ে বড় সেবা খাত, যার সঙ্গে কোটি মানুষের সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবন জড়িত। এ খাত নিয়ে আরও বেশি আলোচনা প্রয়োজন। তবে সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যদি তাঁদের পেশার সঙ্গে একাত্ম না হন, তাহলে সেবায় ঘাটতি থাকবেই। এই মানসিকতার ঘাটতি রয়েছে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। দায়বদ্ধতা ছাড়া সেবার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।

স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে এই খাতের উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করতে চান উল্লেখ করে বিলকিস আক্তার জাহান আরও বলেন, মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যেমন চিকিৎসকদের দায়িত্ব, তেমনি জনগণের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা তাঁর দায়িত্ব। তাই পারস্পরিক সমন্বয় করাও তাঁর দায়িত্বের অংশ। সমস্যাগুলো জানাতে সংশ্লিষ্টদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় সমস্যা ও সমাধান

বরিশাল অঞ্চলের প্রধান সরকারি হাসপাতাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নানা সমস্যা রয়েছে উল্লেখ করে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আরও বলেন, এসব সমস্যার পেছনে শুধু চিকিৎসক বা অবকাঠামো দায়ী নয়, বরং শক্তিশালী সিন্ডিকেট বড় বাধা। প্রশাসন যখনই এসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চায়, তখনই তারা বাধার সৃষ্টি করে। তা সত্ত্বেও সাহস নিয়ে এদের বিরুদ্ধে কথা বলার আহ্বান জানান তিনি।

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দেখেছেন হাসপাতালের ভেতরে মোটরসাইকেল চলাচল করছে, এমনকি রোগীদের লিফটেও মোটরসাইকেল ওঠানো-নামানো হচ্ছে। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ড গড়ে তুলে ব্যবসা চলছিল। এ ছাড়া সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে পুরো ব্যবস্থাই জিম্মি হয়ে পড়েছিল। অনেক চেষ্টায় অ্যাম্বুলেন্স স্ট্যান্ড উচ্ছেদ করা হলেও সহযোগিতা পাওয়া যায়নি।

এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ, সৌন্দর্যবর্ধন, মূল ফটক নির্মাণ এবং সিসিইউর অচল এসি চালু করা হয়েছে। সেবাগুলো অটোমেশনের আওতায় আনা হয়েছে। শিগগিরই রেডিওথেরাপি যন্ত্র স্থাপন করা হবে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এমআরআই মেশিন অকেজো থাকলেও বারবার চিঠি দিয়েও সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। জনবলসংকটে অনেক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে বৃহস্পতিবার ২ হাজার ৭৫২ জন রোগী ভর্তি রয়েছে উল্লেখ করে মশিউল মুনীর আরও বলেন, বহির্বিভাগে প্রতিদিন তিন হাজার রোগী সেবা নেন। সীমিত বাজেট দিয়ে এত বিপুলসংখ্যক রোগীর সেবা নিশ্চিত করা কঠিন।

সরকারি ও বেসরকারি খাতের অবস্থান

গোলটেবিল বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় মানুষ সন্তুষ্ট নয়, এটি বাস্তবতা। তবে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও জনবল, অবকাঠামো ও সরঞ্জাম সেই অনুপাতে বাড়েনি। তাই শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর দায় চাপিয়ে লাভ নেই। সেবা উন্নয়নে জনপ্রতিনিধিদের আরও সক্রিয় হতে হবে।

সিভিল সার্জন এস এম মনজুর-এ-এলাহী মতামত দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালগুলোতে ধারণ ক্ষমতার দেড়-দুই গুণ রোগী থাকে। আমাদের লোকবল, সামর্থ্যও সীমিত। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

বেসরকারি খাত দেশের ৬৫ শতাংশ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করে উল্লেখ করে বৈঠকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, তবু বেসরকারি চিকিৎসা খাত অবজ্ঞা, অবহেলার শিকার। সমালোচনা ও নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। এটা তাঁদের মর্মাহত করে। তিনি বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স সহজ করার দাবি জানান।

রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি

বরিশাল জেলা (দক্ষিণ) বিএনপির সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহীন বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট সরকার গত ১৭ বছর যে বঞ্চনার ইতিহাস তৈরি করেছে, তা ঘোচাতে আমাদের অনেক পরিশ্রম করতে হবে।’

গোলটেবিল বৈঠকে সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসা খাতের সমন্বয়ের উদ্যোগ নিতে সিটি করপোরেশনকে আহ্বান জানান নগর জামায়াতের নায়েবে আমির মাহমুদ হোসাইন।

স্বাস্থ্য খাতে গত ২৫ বছরে ৫ শতাংশ বাজেটও বাড়েনি উল্লেখ করে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) জেলা সমন্বয়ক মনীষা চক্রবর্তী বলেন, কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বাজেট অন্তত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা উচিত। কারখানায় শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে যে আইন রয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মতামত

সুজনের নগর সম্পাদক রফিকুল আলম বলেন, ক্লিনিক্যাল বর্জ্য যত্রতত্র খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে; যা নগরে স্বাস্থ্যঝুঁকি ক্রমেই বাড়াচ্ছে। এ জন্য দ্রুত আধুনিক ব্যবস্থাপনা দরকার।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচারক সাজ্জাদ পারভেজ বলেন, ‘চিকিৎসাসেবার সঙ্গে আমাদের সরাসরি সংযোগ রয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র রোগীদের আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে এই সেবা আমরা প্রতিনিয়ত করছি। এটা যাতে বৃদ্ধি করা যায়, সে লক্ষ্যে উদ্যোগ নিতে হবে।’

গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতে মাল্টি অ্যাডভোকেসি ফোরামের সদস্যসচিব মাহমুদ আল হোসাইন মামুন একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন। প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরীর সঞ্চালনায় এতে আরও বক্তব্য দেন সাংবাদিক সুশান্ত ঘোষ, গণ অধিকার পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, এনসিপির জেলা আহ্বায়ক আবু সাঈদ মুছা, চন্দ্রদ্বীপ সোসাইটির প্রধান নির্বাহী সামিয়া আলী অন্না, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ব্লাড ডোনার ক্লুবের সভাপতি কামরুন নাহার মোহনা প্রমুখ। সূচনা বক্তব্য দেন প্রথম আলোর বরিশালের নিজস্ব প্রতিবেদক এম জসীম উদ্দীন এবং ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক দীপু হাফিজুর রহমান।