কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল: চিকিৎসক ও সরঞ্জাম সংকটে ধুঁকছে স্বাস্থ্যসেবা
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, যা জেলার বিশ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রধান আশ্রয়স্থল, বর্তমানে নানা সংকটে জর্জরিত হয়ে নিজেই যেন একটি ‘দুরারোগ্য’ রোগে আক্রান্ত। কয়েক দশক ধরে চলমান চিকিৎসক, কর্মচারী এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে হাসপাতালটির স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা তলানিতে পৌঁছেছে। পত্র চালাচালি এবং বারবার প্রতিবেদন দেওয়া সত্ত্বেও কার্যকর কোনও সমাধান না আসায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
চিকিৎসক সংকট: ১৭৮ জনের প্রয়োজনে মাত্র ২৩ জন
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ৫০ শয্যার এই হাসপাতালটি পরবর্তীতে ১০০ শয্যায় উন্নীত হয় এবং ২০১৭ সালে ২৫০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরিত হয়। তবে বর্তমানে ১৭৮ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ২৩ জন। মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি এবং কার্ডিওলজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতে কোনও সিনিয়র কনসালটেন্ট নেই, এবং জুনিয়র কনসালটেন্ট, মেডিক্যাল অফিসার, রেজিস্ট্রার সহ অন্যান্য পদেও ব্যাপক শূন্যতা বিরাজ করছে।
এই সংকটের প্রভাব সরাসরি রোগীদের উপর পড়ছে। বহির্বিভাগে রোগীর চাপ সামলাতে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা হিমশিম খাচ্ছেন, আর ভর্তি রোগীদের জন্য সারাদিনে মাত্র একবার চিকিৎসকের দেখা মেলা একটি সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জরুরি বিভাগে প্রায়শই শুধুমাত্র উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার (সেকমো) দিয়ে নামমাত্র চিকিৎসা শুরু করতে হয়, যা মাঝে মাঝেই ‘ভুল চিকিৎসা’ বা ‘চিকিৎসা অবহেলা’র অভিযোগ তৈরি করছে।
আধুনিক সুবিধার অভাব: আইসিইউ ও এনআইসিইউ নেই
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আধুনিক সুবিধা সংবলিত একটি ৮তলা ভবন নির্মাণ করা হলেও জেলাবাসী তার সুবিধা ভোগ করতে পারছেন না। নতুন ভবনে প্রয়োজনীয় পরিসর থাকলেও আইসিইউ সুবিধা স্থাপন করা হয়নি, এবং শিশুদের জন্য অতি জরুরি এনআইসিইউ সুবিধাও অনুপস্থিত। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের আইসিইউ বা এনআইসিইউ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, এবং অনেককে রংপুরে পাঠানো হচ্ছে, যার ফলে পথেই অনেকে মৃত্যুবরণ করছেন।
চিকিৎসা সরঞ্জাম সংকট: অকেজো যন্ত্রপাতি ও অব্যবহৃত মেশিন
চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটও তীব্র। হাসপাতালটিতে সিটিস্ক্যান ও এমআরআই মেশিনের মতো আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। ইকোকার্ডিওগ্রাম, এন্ডস্কপি এবং ল্যাপরোস্কপি মেশিন থাকলেও সেগুলো কয়েক বছর ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। অপারেশনের যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করার জন্য আধুনিক অটোক্লেভ মেশিনের পরিবর্তে পুরনো একটি ছোট মেশিন ব্যবহার করতে হচ্ছে। এছাড়া, চাহিদার ৬টি ইসিজি মেশিনের বিপরীতে মাত্র ৩টি রয়েছে, এবং বেশ কিছু মূল্যবান মেশিন সরবরাহকারীর পাওনা পরিশোধ ও জনবলের অভাবে বাক্সবন্দি হয়ে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে।
জনবল ও পরিবেশগত সংকট: কর্মচারী থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, যেমন আয়া, ওয়ার্ড বয়, ক্লিনার এবং সিকিউরিটি গার্ডের পদেও প্রয়োজনীয় জনবল নেই, যা আদালতের নিষেধাজ্ঞার কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় আরও জটিল হয়েছে। হাসপাতালটিতে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনারও অভাব রয়েছে, যেখানে চিকিৎসা বর্জ্য পাশের পুকুর পাড়ে ফেলে রাখা হচ্ছে, যা রোগী ও আশেপাশের বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া: সীমিত সুযোগে সেবা দেওয়ার চেষ্টা
হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়ক ডা. নুর নেওয়াজ আহমেদ জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘চিকিৎসকসহ অনেক বিষয়ে সংকট রয়েছে। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চাহিদা পাঠিয়েছি, এবং সম্প্রতি চার জন চিকিৎসক যোগদান করলেও তা চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। অন্যান্য চাহিদার বিষয়ে আমরা বারবার কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নিলে আমাদের করণীয় কিছু থাকে না। সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আমরা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে, যা জেলার লক্ষাধিক মানুষের জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।



