বদলির আদেশ অমান্য করে ১৬ মাস ধরে কর্মস্থলে বহাল নেত্রকোনার ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য কর্মকর্তা
নেত্রকোনার মদন উপজেলার ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাক্তার মুহাম্মদ নূরুল হুদা খান সরকারি বদলির আদেশ স্পষ্টভাবে অমান্য করে প্রায় ১৬ মাস ধরে তার পূর্বের কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন। ২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাকে বান্দরবানে বদলির আদেশ দেওয়া হলেও তিনি এখনো মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব পালন করছেন, যা স্থানীয় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বদলির আদেশ ও শর্তাবলি
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পক্ষে পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এ বি এম আবু হানিফ স্বাক্ষরিত আদেশে ডাক্তার মুহাম্মদ নূরুল হুদা খানকে সহকারি সার্জন হিসেবে বান্দরবানে বদলি দেওয়া হয়। উক্ত আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, তাকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে হবে এবং অন্যথায় ষষ্ঠ কর্মদিবসে তাকে অবমুক্ত হিসেবে গণ্য করা হবে।
কিন্তু আদেশ জারির প্রায় ১৬ মাস পরও তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করে মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি নির্দেশ অমান্য করা একটি গুরুতর প্রশাসনিক শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কর্মস্থলে অনিয়মিত উপস্থিতি ও অতীতের অভিযোগ
ডাক্তার নূরুল হুদা খানের বিরুদ্ধে স্থানীয়ভাবে আরও বেশ কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তিনি মদন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগদানের পর থেকেই নিয়মিতভাবে কর্মস্থলে অবস্থান করেন না বলে জানা গেছে। সপ্তাহে মাত্র দুই থেকে তিন দিন তিনি অফিসে উপস্থিত থাকেন, যা স্বাস্থ্যসেবার মানকে ব্যাহত করছে।
তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে, মদন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি গাড়ি কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ২০২৩ সালে কেন্দুয়া উপজেলার একটি ক্লিনিকে ব্যবহার করা হয়েছে। এই ঘটনায় দৈনিক যুগান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ময়মনসিংহ সিভিল সার্জনকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে এখন পর্যন্ত সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
পেশাগত পরিচয় ও কর্মচারীদের প্রতিক্রিয়া
যুগান্তরের অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে যে, ডাক্তার নূরুল হুদা খান স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো বিসিএস কর্মকর্তা নন। তিনি সাধারণত এডহক ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও প্রায়শই নিজেকে বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি তার ভিজিটিং কার্ডে বিসিএস কর্মকর্তা লিখে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হিসেবে পরিচয় দিয়ে কেন্দুয়া উপজেলা ও ঢাকার ক্লিনিকগুলোতে নিয়মিত রোগী দেখেন।
মদন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত কয়েকজন কর্মচারী ন anonymity চাইতে জানিয়েছেন যে, তার আসার পর থেকে হাসপাতালটির অবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবার মান মারাত্মকভাবে অবনতি হয়েছে। তারা এমন দায়হীন কর্মকর্তার দ্রুত বদলি কামনা করেছেন।
প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া ও নীরবতা
এ ব্যাপারে মদন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রী জানিয়েছেন যে, বদলির আদেশ বাস্তবায়ন করা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রশাসনিক দায়িত্ব। সরকারি নির্দেশ অমান্য করা শৃঙ্খলাভঙ্গের অন্তর্ভুক্ত এবং কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকা খুবই দুঃখজনক। তিনি বিষয়টি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করার কথা বলেছেন।
নেত্রকোনা সিভিল সার্জন ডাক্তার মো. গোলাম মাওলা জানিয়েছেন যে, এই বদলির আদেশ তার যোগদানের আগেই জারি হয়েছে এবং বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভালোভাবে জানে।
ডাক্তার মুহাম্মদ নূরুল হুদা খানের মোবাইল নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো এবং একাধিকবার ফোন করার পরও তিনি কোনো উত্তর দেননি বা ফোন রিসিভ করেননি। এই নীরবতা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলছে।
হাওরাঞ্চলের প্রায় তিন লক্ষাধিক মানুষের একমাত্র স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র মদন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমন অনিয়ম ও দায়িত্বহীনতা স্থানীয় জনগণের জন্য মারাত্মক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও জবাবদিহিতা এখন সময়ের দাবি।



