আইসিইউ সংকটে ১১ দিনে ৩৩ শিশুর মৃত্যু: স্বাস্থ্যব্যবস্থার হতাশাজনক চিত্র
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের (আইসিইউ) মারাত্মক সংকটে ১১ দিনে ৩৩টি শিশুর মৃত্যুর ঘটনাটি বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি হতাশাজনক ও বেদনাদায়ক চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে। এই ট্র্যাজেডি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের মৌলিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রদানে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা এখনো অক্ষম ও অপ্রতুল রয়ে গেছে। জটিল ও সংকটাপন্ন রোগীদের জীবন রক্ষায় আইসিইউ চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি অপরিহার্য আশীর্বাদ হলেও, বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মাত্র দুই হাজারের মতো আইসিইউ শয্যা বিদ্যমান, যা প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। ফলে শুধুমাত্র বৃদ্ধ রোগীরাই নন, শিশু ও তরুণ বয়সী রোগীরাও প্রায়শই মৃত্যুর কাছে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
চার দশক পরেও আইসিইউ সেবার অপ্রতুলতা
উন্নত বিশ্বে বহু আগে থেকেই প্রচলিত হলেও, বাংলাদেশে আইসিইউ সেবা প্রথম চালু হয় গত শতকের আশির দশকে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, চার দশক পার হওয়ার পরেও দেশের সব শ্রেণির নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয়, মানসম্পন্ন ও সুলভ আইসিইউ সেবা গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রগুলোতে দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় জনবলের মারাত্মক সংকট বিদ্যমান। করোনা মহামারি এবং ২০১৯ ও ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, একটি আইসিইউ বেড কতটা মূল্যবান ও জীবনরক্ষাকারী হতে পারে। এরপরও স্বাস্থ্য বিভাগের যথাযথ সচেতনতা ও পদক্ষেপের অভাব প্রকটভাবে লক্ষণীয়, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
বাজেট বরাদ্দ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ঘাটতি
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই চিকিৎসা ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ নাগরিকদের নিজেদেরই বহন করতে হয়। গত কয়েক দশকে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের শাসনামলে, স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অপ্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটার পেছনে ব্যয় করা হয়েছে। জিডিপির মাত্র ১ শতাংশের কম বরাদ্দ দিয়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশা করাটা ইতিমধ্যেই একটি দুরাশা, আর তার ওপর গোষ্ঠীস্বার্থে গৃহীত প্রকল্পের কারণে এই খাতে বরাদ্দের সুফল সাধারণ নাগরিকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না বললেই চলে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাস্তবতা
করোনা মহামারির সময় ঢাকার ওপর চাপ কমাতে জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতে আইসিইউ ইউনিট স্থাপনের কথা জোরালোভাবে আলোচিত হয়েছিল। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সরকারি উদ্যোগে নতুন করে ৭২৮টি আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে বাস্তবে এর কয়টি সচল ও কার্যকর রয়েছে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন ও সন্দেহ বিদ্যমান। কারণ, আইসিইউ চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, দেশের সবচেয়ে বড় আইসিইউ কমপ্লেক্সটি চালু করার ব্যাপারে সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়নি। ফলে ৬০ শয্যার সক্ষমতা থাকলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব উদ্যোগে মাত্র ৪০টি শয্যা চালু রাখতে হয়েছে। এর মধ্যে শিশুদের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ১২টি আইসিইউ শয্যা। অথচ শিশুদের আইসিইউর চাহিদা অত্যন্ত বেশি, কারণ রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের জন্য একমাত্র শিশুদের জন্য নিবেদিত আইসিইউ এই হাসপাতালেই রয়েছে। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষার পরেও সেবা না পেয়ে একের পর এক শিশুর মৃত্যু ঘটছে। অন্যদিকে, রাজশাহীতেই একটি শিশু হাসপাতালের নির্মাণকাজ দুই বছর আগে সম্পন্ন হলেও লোকবল নিয়োগ না দেওয়ার কারণে সেটি এখনো চালু হয়নি, যা আরও বেশি হতাশাজনক।
চিকিৎসক ও পরিবারগুলোর আর্তি
শুধুমাত্র ভুক্তভোগী পরিবারগুলোই নন, চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও কর্মীদের জন্যও এই পরিস্থিতি একটি বড় অসহায়ত্ব ও মানসিক যন্ত্রণার বিষয়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামালের আক্ষেপ, "আইসিইউ সেবা পেলে ৩৩টি শিশু বেঁচেও যেতে পারত", সেই আর্তিরই প্রতিধ্বনি। বেসরকারি পর্যায়ে আইসিইউ সেবার উচ্চ খরচ জোগাড় করার মতো আর্থিক সামর্থ্য নেই বলেই কি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা আইসিইউ সেবার জন্য অপেক্ষা করতে করতেই মৃত্যুবরণ করবে? এটি একটি গভীর ও উদ্বেগজনক প্রশ্ন।
রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
আইসিইউর অপেক্ষায় থেকে শিশুমৃত্যুর এই করুণ ঘটনাগুলো নাগরিকের মৌলিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও সরকারের প্রতিশ্রুতিকেই সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। অনেকের মতে, সম্পদের স্বল্পতা নয়; বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও অগ্রাধিকারের অভাবেই এই সংকটের স্থায়ী সমাধান বাস্তবায়ন করা যায়নি। শুধুমাত্র রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালই নয়, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের সব সরকারি হাসপাতালে পূর্ণ সক্ষমতার আইসিইউ সেবা চালু করতে হবে। সরকারি পর্যায়ে ধাপে ধাপে আইসিইউ সেবার পরিধি বাড়ানো এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের উপর জোর দিতে হবে। নাগরিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন সরকারকে নতুন করে ভাবতে ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি পুনরাবৃত্তি না হয়।



