রাজশাহীতে আইসিইউ সংকটে শিশুমৃত্যু: অপেক্ষার তালিকায় ৩৮ শিশু, আড়াই মাসে মৃত্যু ৬২
আইসিইউ সংকটে রাজশাহীতে শিশুমৃত্যু, আড়াই মাসে ৬২ প্রাণহানি

আইসিইউ বেডের অপেক্ষায় শিশুমৃত্যুর করুণ গল্প

রাজশাহীর পবা উপজেলার মুরারিপুর এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নূহ আলমের জীবন এখন এক অনিশ্চিত অপেক্ষার নাম। তার সাড়ে আট মাস বয়সী শিশুসন্তান নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে শুয়ে আছে প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে। চিকিৎসকরা জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও সেখানে বেড খালি নেই। নূহ আলমের সিরিয়াল নম্বর ২৭। আইসিইউর সামনে দিন কাটছে এই আশায় যে কোনো মুহূর্তে বেড খালি হতে পারে। কিন্তু তার শিশুর ভাগ্যে কী আছে, তা নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।

আড়াই মাসে ৬২ শিশুর মৃত্যু

নূহ আলমের মতো শত শত অভিভাবকের করুণ কাহিনী মিশে আছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের করিডরে। গত আড়াই মাসে আইসিইউ সুবিধা না পেয়ে এই হাসপাতালে ৫৩টি শিশু মারা গেছে। শুধু ১১ থেকে ২২ মার্চের মধ্যেই আইসিইউর জন্য অপেক্ষায় থাকা ৩৩ শিশুর প্রাণহানি ঘটেছে। বুধবার সকাল পর্যন্ত আইসিইউ বেডের জন্য অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল ৩৮ শিশু। স্বজন ও সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, আইসিইউ বেডের সংকটেই এসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

নগরীর তেরখাদিয়া এলাকার সাহিদের শিশুসন্তান নাহিদ ১৩ মার্চ এই হাসপাতালে মারা যায়। আইসিইউতে নেওয়ার জন্য চিকিৎসক পরামর্শ দেওয়ার তিন দিন পর তার ছেলে মারা যায়। এই তিন দিনে চেষ্টা করেও ছেলেকে আইসিইউতে নিতে পারেননি সাহিদ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১২ শয্যার আইসিইউ, অসহায়ত্বের প্রতীক

রামেক হাসপাতালের আইসিইউর ইনচার্জ ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, ১২ শয্যার শিশু আইসিইউতে কেউ মারা না গেলে সাধারণত খালি হয় না। কোনও শিশু মারা গেলে বেড ফাঁকা হয়। তখন অপেক্ষমাণ তালিকা ধরে ফোন করা হয়। এভাবে অপেক্ষায় থেকে আইসিইউ না পেয়ে গত আড়াই মাসে ৫৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ১১ থেকে ১৮ মার্চের মধ্যেই আইসিইউতে ভর্তির অপেক্ষায় থাকা ২৮ শিশু মারা গেছে। আর ভর্তির পর মারা গেছে আরও নয় শিশু। সব মিলিয়ে মোট শিশুমৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬২।

ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামালের ভাষ্যে, "১৯ মার্চ সকালে একটি শিশু মারা গেছে। সে অপেক্ষমাণ তালিকার ৩৭ নম্বরে ছিল। তার মা কাঁদতে কাঁদতে মোবাইলে বলেছিল, এত জায়গা থেকে তদবির করালাম, তবু আমার বাচ্চাকে আইসিইউ বেড দিলেন না, বেড পেলে বাচ্চাটা বাঁচতো।"

হাম ও নিউমোনিয়ার ভয়াবহতা

চিকিৎসকরা বলছেন, নিউমোনিয়ার পাশাপাশি হাম মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। অভিভাবকরা শিশুদের টিকার ডোজ সম্পন্ন করছেন না। এ কারণে হাম হচ্ছে বেশি। হামে শিশুমৃত্যুর ঘটনাকে উদ্বেগজনকও বলছেন তারা। রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে স্বীকার করে বলেন, "আমাদের নিয়মিত টিকা কার্যক্রম চলমান। কিন্তু কী কারণে হাম বাড়ল তা বলা যাচ্ছে না। তবে সারাদেশে শিগগিরই টিকা ক্যাম্পেইন করা হবে।"

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মৃত শিশুদের বেশির ভাগই ছিল নিউমোনিয়া ও হাম আক্রান্ত। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী এসব রোগের জটিলতা বাড়লে দ্রুত নিবিড় পরিচর্যার প্রয়োজন হয়; কিন্তু রামেক হাসপাতালে শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত আইসিইউ নেই। স্থানীয়ভাবে সাধারণ আইসিইউর ১২টি বেড শিশুদের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে। ফলে বেড খালি না থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

ওয়ার্ডে মানবিক বিপর্যয়

শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি বেডে একাধিক রোগী, কোথাও মেঝেতেও চলছে চিকিৎসা। অক্সিজেনের জন্য অপেক্ষা। এক বেডে ২/৩ জন করে শিশু রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রোগীর স্বজনদের ঠাসাঠাসি আর গাদাগাদি। নার্সদের ব্যস্ততা আর স্বজনদের উৎকণ্ঠা সব মিলিয়ে এক চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে ওয়ার্ডজুড়ে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার তরিকুল ইসলাম জানান, তার ছয় মাসের শিশু রিদুয়ান হাম আক্রান্ত ছিল। হাসপাতালে ভর্তির পর অবস্থা আরও জটিল হয়; কিন্তু অপেক্ষায় থেকে থেকে আইসিইউ পাননি। গত ১৮ মার্চ শিশুটি মারা যায়। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার শাহীন হোসেনের ১০ মাস বয়সী শিশু জিহাদ শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। সেও হামে আক্রান্ত। তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন চিকিৎসক; কিন্তু সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করে শিশুটির জন্য আইসিইউ পাওয়া যায়নি। অবশেষে ১৮ মার্চ দুপুরে জিহাদ মারা যায়।

অবকাঠামো সংকট ও সরকারি উদ্যোগ

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৬০ শয্যাবিশিষ্ট দেশের বৃহত্তম আইসিইউ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, এর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য শয্যা ৪০ ও শিশুদের ২০টি। কিন্তু এটি সরকারের অনুমোদন পায়নি। চলছে হাসপাতালের নিজস্ব উদ্যোগে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থায় প্রাপ্তবয়স্কদের ৪০টি শয্যার মধ্যে যুবকদের ১২টি, বয়স্কদের জন্য ১৬ ও ১২টি শয্যা শিশুদের জন্য ব্যবহার করছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবল সরবরাহ না করায় শিশুদের ২০টি শয্যা চালু করা যাচ্ছে না।

রামেকের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম বলেন, "রাজশাহী মেডিক্যালে বর্তমানে ৪০ শয্যার যে আইসিইউ চলছে, সেটা সরকার অনুমোদিত নয়। সম্পূর্ণ হাসপাতালের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলে এটি। এখানে সরকার একজনকেও নিয়োগ দেয়নি।"

এদিকে রাজশাহী নগরীর লক্ষ্মীপুর এলাকায় ২০০ শয্যার একটি শিশু হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ১০ শয্যার শিশুদের আইসিইউ আছে। ২০২৩ সালে নির্মাণকাজ শেষ হলেও কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি হস্তান্তরই করেনি, জনবল কাঠামো অনুমোদন হয়নি।

আইসিইউর ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামালের মতে, রাজশাহীতে শিশু হাসপাতাল বিল্ডিং, শিশু আইসিইউর অবকাঠামো সব তৈরি হয়ে আছে। শুধু দরকার সরকারি সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও সদিচ্ছা। ২০২৪ সালের জুনে স্বাস্থ্য অধিদফতর প্রকাশিত ‘হেলথ বুলেটিন ২০২৩’ অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশে সরকারি উদ্যোগে মোট ৭২৮টি নতুন আইসিইউ শয্যা স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু রাজশাহীর এই সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, সংখ্যার হিসাব নয়, বরং কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও বরাদ্দই এখন সবচেয়ে জরুরি।