সাত বছর অপেক্ষার পর জন্ম নেওয়া শুভজিতের মুখ দেখতে পারলেন না বাবা সুব্রত
সাত বছরের দীর্ঘ অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত ঘরে এলো সন্তান। কিন্তু বাবা হওয়ার আনন্দের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে যাঁর উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি কাম্য ছিল, তিনি তখন আর এই দুনিয়ায় নেই। গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে করমজল খালে কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারান সুব্রত মণ্ডল। তাঁর স্মৃতি ধরে রাখতেই নবজাতক পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয়েছে শুভজিৎ।
ঈদের আগের দিন খুলনায় অস্ত্রোপচারে জন্ম নিল শুভজিৎ
ঈদের ঠিক আগের দিন খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সুব্রত মণ্ডলের স্ত্রী মুন্নী খাঁ পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। ২৩ মার্চ ছেলেকে নিয়ে নিজের নানি অপর্ণা পাটোয়ারীর বাড়ি ফিরেছেন মুন্নী। সুব্রত মণ্ডল ছিলেন খুলনার দাকোপ উপজেলার পূর্ব ঢাংমারী এলাকার কুমুদ মণ্ডলের ছেলে। মুন্নীর নানিবাড়িও একই এলাকায় অবস্থিত।
মুন্নীর জীবন শুরু থেকেই সংগ্রামময়। যখন তাঁর বয়স মাত্র আট মাস, তখন বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে বাবার মুখের আদর মুন্নীর মনে নেই বললেই চলে। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর মা আবার বিয়ে করেন এবং মুন্নী বড় হন নানির কোলে।
বাবার মুখ দেখতে পেল না শুভজিৎ
২৪ মার্চ মুঠোফোনে মুন্নীর সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেটা ওর বাবার মুখটা দেখতে পেল না। বাবার নামের সঙ্গে মিলিয়ে ছেলের নাম রাখছি শুভজিৎ।’ এই কথাগুলো যেন বেদনায় ভরা এক মায়ের হৃদয়স্পর্শী স্বীকারোক্তি।
কুমিরের কবলে প্রাণ গেল সুব্রতের
গত বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর, দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর দিন সকালে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন সুব্রত মণ্ডল। সংসারে টাকার টানাটানি এবং স্ত্রীর অসুস্থতা সত্ত্বেও কাঁকড়া ধরতে তাঁকে সুন্দরবনে যেতেই হয়েছিল। খুলনার দাকোপ উপজেলার পূর্ব ঢাংমারী এলাকা থেকে করমজল খালের দূরত্ব মাত্র দুই কিলোমিটারের মতো। সেদিনও অন্য দিনের মতো সঙ্গীদের নিয়ে বনে গিয়েছিলেন সুব্রত।
ফেরার পথে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের করমজল খাল সাঁতরে পার হওয়ার সময় হঠাৎ কুমির আক্রমণ করে তাঁকে। ঘটনার প্রায় সাত ঘণ্টা পর করমজল খালের গজালমারী এলাকা থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেদিনের স্মৃতিচারণা করে মুন্নী বলেন, ‘বেলা সাড়ে তিনটা বাজে, তবু মানুষটা ফিরল না। পরে শুনি কুমিরে ধরছে, লাশ পাওয়া যাচ্ছে না। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রশাসন ও গ্রামের অন্য মানুষেরা লাশ বাড়িতে নিয়ে আসে।’
সুন্দরবনে কুমিরের আক্রমণ: এক ভয়াবহ বাস্তবতা
সুব্রতের সঙ্গে সেদিন ছিলেন সুন্দরবন যুব সংঘের সহসভাপতি জুয়েল সরদারসহ আরও চারজন। প্রায় ২০ বছর ধরে একসঙ্গে বনজীবী হিসেবে কাজ করতেন তাঁরা। জুয়েল বলেন, সেদিন কাঁকড়া সংগ্রহ করে ফেরার পথে করমজল খাল পার হওয়ার সময় কুমির সুব্রতের পায়ে কামড়ে ধরে। তাঁরা চারজন কিছুক্ষণ কুমিরের মুখ থেকে সুব্রতকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু শেষে কুমিরের শক্তির কাছে হার মানতে বাধ্য হন। কুমির সুব্রতকে নিয়ে পানিতে ডুব দেয় এবং অনেকক্ষণ পর ভেসে ওঠে। জোয়ার থাকায় তখন কেউ পানিতে নামতে পারেননি। পরে ট্রলারের শব্দে কুমির মুখ থেকে সুব্রতকে ছেড়ে দেয় এবং বন বিভাগের কর্মীসহ অন্যরা মরদেহ উদ্ধার করেন।
ভালোবাসার বাধা পেরিয়ে সংসার, কিন্তু ভাগ্য নির্মম
সুব্রত ও মুন্নী ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু দুজনের দুই ধর্মের পরিবার হওয়ায় প্রথম দিকে এই বিয়ে সহজে মেনে নেয়নি কেউ। দুই বছরের বেশি সময় শ্বশুরবাড়িতে স্বাভাবিক পরিবেশ পাননি মুন্নী। পরে ধীরে ধীরে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। কিন্তু সংসার স্বাভাবিক হওয়ার পরই কুমিরের আক্রমণে প্রাণ হারান সুব্রত।
সুব্রতের মৃত্যুর পর স্থানীয়ভাবে অনেকেই মুন্নীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। সুন্দরবন নিয়ে কনটেন্ট নির্মাতা ও সাংবাদিক মোহসীন উল হাকিম বিভিন্ন সময় আর্থিক সহায়তা করেছেন। গত ২২ মার্চ মুন্নীর নবজাতক ছেলেকে দেখতে খুলনার হাসপাতালে গিয়েছিলেন মোহসীন উল হাকিম এবং নিজের ফেসবুক পেজে নবজাতককে কোলে নিয়ে ছবি পোস্ট করেছেন।
সরকারি সহায়তা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
সুব্রত মণ্ডল বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে বৈধভাবে কাঁকড়া আহরণ করতে বনে গিয়েছিলেন। বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী, বৈধভাবে বনে প্রবেশ করে বাঘ বা কুমিরের আক্রমণে মৃত্যু হলে জেলের পরিবারকে সরকারিভাবে তিন লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়। গত ১৫ মার্চ সুব্রত মণ্ডলের মা বামনী মণ্ডলের হাতে বাগেরহাটের সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ কার্যালয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী তিন লাখ টাকার চেক তুলে দিয়েছেন। মুন্নী শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি।
তবে মুন্নীর সামনে এখন আরও বড় চিন্তা—স্বামীর রেখে যাওয়া প্রায় এক লাখ টাকার ঋণ এবং ছেলের ভবিষ্যৎ। মুন্নী বলেন, ‘আমি চাই আমার ছেলে সুস্থ থাক, কোলে থাক। বড় হয়ে ছেলে ওর বাবার মতো কাজ করুক, তা চাই না।’ জুয়েল সরদারও বলেন, সুব্রত মণ্ডলের ছেলের জন্য যা যা ভালো হবে, সবাইকে তা–ই করার চেষ্টা করতে হবে।
শুধু সুব্রত নন, গত কয়েক বছরে কুমিরের আক্রমণে একাধিক বনজীবী মারা গেছেন। তাঁদের একজন মোশাররফ গাজী। মোশাররফের বাড়িতেই একটি ঘর করে থাকতেন মুন্নী দম্পতি। সন্তান প্রসবের আগে মুন্নীকে বাগেরহাটের মোংলা, সেখান থেকে খুলনার হাসপাতালে ভর্তি, তারপর বাড়ি ফেরা—সব সময় স্বজনদের মতো মুন্নীর পাশে ছিলেন মোশাররফ গাজীর স্ত্রী ফাতেমা বেগম।



