সুনামগঞ্জে শিশু মৃত্যুতে উত্তেজনা: চিকিৎসা সহকারীকে মারধর, বিএনপি নেতার আশ্বাস
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় উত্তেজিত জনতা কর্তব্যরত চিকিৎসা সহকারীকে মারধর করেছেন। রোববার সন্ধ্যায় এই ঘটনা ঘটে, যেখানে ১১ মাস বয়সী শিশু ফারাবির মৃত্যুতে স্বজনরা চিকিৎসা সহকারী রঞ্জন কিশোর চাকলাদারের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তুলেছেন।
ঘটনার বিবরণ
সর্দি ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা নিয়ে রোববার বেলা দেড়টার দিকে শিশু ফারাবিকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়। স্বজনদের দাবি, কর্তব্যরত উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা রঞ্জন কিশোর চাকলাদার তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসাসেবা না দিয়ে ৪০ মিনিট পর শিশুটিকে দেখে ভর্তির কাগজপত্র লিখে দেন।
বেলা সোয়া দুইটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত চারজন চিকিৎসক শিশুটিকে সেবা দেন। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য ওয়ার্ড থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রবেশমুখে আসামাত্রই সন্ধ্যা সোয়া ছয়টার দিকে শিশুটি অচেতন হয়ে পড়লে আবার জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। তখন শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
উত্তেজনা ও মারধর
খবর পেয়ে রোগীর স্বজন ও বিক্ষুব্ধ ৫০ থেকে ৬০ জন ব্যক্তি রাত পৌনে আটটার দিকে জরুরি বিভাগের সামনে চিৎকার শুরু করেন। একপর্যায়ে কয়েকজন জরুরি বিভাগের ভেতরে ঢুকে রঞ্জন কিশোর চাকলাদারকে কক্ষ থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে কিল–ঘুষি মেরে আহত করেন। পাশাপাশি জরুরি বিভাগের আসবাব ও যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করেন। কয়েকজন কর্মীর সহায়তায় ওই চিকিৎসা সহকারী প্রাণে রক্ষা পান।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ
খবর পেয়ে ধর্মপাশা থানা-পুলিশ, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুল ইসলাম, সদস্য মজিবুর রহমান মজুমদারসহ ১৫ থেকে ২০ জন সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন। রাত নয়টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
স্বজনদের অভিযোগ
শিশুটির চাচা শেখ চান (৩০) বলেন, ‘আমার ১১ মাস বয়সী ভাতিজাকে ভর্তি করার সময় জরুরি বিভাগের ডাক্তার ৪০ মিনিট দেরি করেছেন। আমার ভাতিজা মুমূর্ষু থাকলেও তাকে না দেখে তিনি অন্য রোগী দেখছিলেন। এ ছাড়া আমার ভাতিজার প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট হলেও নেবুলাইজার ও অক্সিজেন দেওয়ার জন্য দুজন নার্সের কাছে বারবার গেলে তাঁরা গুরুত্ব দেননি। জরুরি বিভাগের ডাক্তার ও এই দুজন নার্সের অবহেলার কারণেই আমার ভাতিজার মৃত্যু হয়েছে। আমরা এ ঘটনায় জড়িত এই তিনজনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
অভিযোগ অস্বীকার
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রঞ্জন কিশোর চাকলাদার। নার্স পলাশ গোস্বামী বলেন, ‘স্যারদের (ডাক্তারদের) নির্দেশনা অনুযায়ী যা যা সেবা দেওয়ার দরকার, আমরা তাই দিয়েছি।’ অপর নার্স সঙ্গীতা বিশ্বাস ফোন না ধরায় তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
বিএনপি নেতার বক্তব্য
উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ও থানা-পুলিশ মিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছি। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন অবহেলার ঘটনা ঘটে থাকলে ভিডিও ফুটেজ দেখে তিনি জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন।’
কর্মকর্তার প্রতিক্রিয়া
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সুবীর সরকার বলেন, ‘আমরা শিশুটিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়েছি। নেবুলাইজার ও অক্সিজেনও দেওয়া হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে দুজন নার্সের ও উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের যদি কোনো ধরনের অবহেলা ঘটনার সত্যতা থাকে, তাহলে ভিডিও ফুটেজ দেখে তাঁদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জরুরি বিভাগে ঢুকে চিকিৎসা সহকারীকে মারধর ও আসবাব এবং যন্ত্র ভাঙচুর করার ঘটনাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’
মৃত শিশুটি উপজেলার সেলবরষ ইউনিয়নের বগারপাছুর গ্রামের কাঠমিস্ত্রি মানিক মিয়ার ছেলে। এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং স্বাস্থ্য সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।



