চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমআরআই যন্ত্র আবারও অচল: রোগীদের ওপর মারাত্মক প্রভাব
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল শুধুমাত্র চট্টগ্রাম শহর নয়, বরং কক্সবাজার, পার্বত্য জেলা, নোয়াখালীসহ সমগ্র দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের জন্য চিকিৎসা সেবার একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। তবে অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে, এই হাসপাতালের অত্যাবশ্যকীয় ‘এমআরআই’ যন্ত্রটি আবারও বিকল হয়ে পড়েছে, যা রোগীদের চিকিৎসায় ব্যাপক বিঘ্ন সৃষ্টি করছে।
মাত্র ৯ মাস পর আবারও অকেজো: কোটি টাকার অপচয়
গত বছরের জুন মাসে প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করে এই এমআরআই যন্ত্রটি চালু করা হয়েছিল, যা আগে তিন বছর ধরে অচল ছিল। কিন্তু মাত্র ৯ মাসের মাথায় যন্ত্রটি আবারও অকেজো হয়ে যাওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও অব্যবস্থাপনা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের এই যন্ত্রটি ২০১৭ সালে স্থাপনের পর থেকে একাধিকবার অচল হয়েছে, যা কোটি কোটি টাকা খরচ করে মেরামতের পরেও বারবার বিকল হওয়ার কারণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির টানাপোড়েন: একটি বড় সমস্যা
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি’ বা সিএমসি (সেন্ট্রাল মেইনটেন্যান্স কন্ট্রাক্ট) নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টানাপোড়েন চলছে। ২০১৯ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও চমেক এখনো এই চুক্তির আওতায় আসতে পারেনি, ফলে যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে মেরামত করতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে। সিএমসি চুক্তি থাকলে মেরামতের খরচ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বহন করত, কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই চুক্তি ঝুলে থাকায় জবাবদিহিতার অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে।
রোগীদের ওপর সরাসরি প্রভাব: পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ
বর্তমানে যন্ত্রটির ‘গ্র্যাডিয়েন্ট অ্যামপ্লিফায়ার’ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ৬ মার্চ থেকে সমস্ত এমআরআই পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ ও নিম্নবিত্ত রোগীদের ওপর, যারা বেসরকারি হাসপাতালে উচ্চ খরচে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ২ হাজার ২০০ শয্যার এই বিশাল হাসপাতালে মাত্র একটি এমআরআই যন্ত্র থাকা এমনিতেই অপ্রতুল, এবং সেটিও অচল থাকায় চিকিৎসা সেবার মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আপাতসমাধান ও দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগের অভাব
চমেক হাসপাতালের পরিচালক জানিয়েছেন যে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি অকেজো মেশিন থেকে যন্ত্রাংশ এনে এটি সচল করার চেষ্টা চলছে। যদিও এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এই সমাধান কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়ে গেছে। পুরোনো যন্ত্রাংশ দিয়ে তালি দেওয়ার পরিবর্তে, হাসপাতালের নতুন রেডিওলজি ভবনে প্রস্তাবিত দুটি নতুন এমআরআই মেশিন দ্রুত স্থাপন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
তদন্ত ও জবাবদিহিতার দাবি
মেরামতের মাত্র ৯ মাস পর যন্ত্রটি আবারও বিকল হওয়ার পেছনে কোনো কারিগরি ত্রুটি বা দুর্নীতির যোগসূত্র আছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা উচিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করতে এবং ভবিষ্যতে এমন সমস্যা প্রতিরোধ করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন:
- রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করা এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় বাড়ানো।
- নতুন এমআরআই মেশিন স্থাপনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা।
- যন্ত্রের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা।
- প্রতিটি মেরামত ও খরচের বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এমআরআই যন্ত্রের এই সংকট শুধুমাত্র একটি যান্ত্রিক সমস্যা নয়, বরং এটি পুরো অঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অবহেলার একটি প্রতিচ্ছবি। দ্রুত ও কার্যকর সমাধান না পেলে রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
