শেবাচিম হাসপাতালে সেবিকাদের দায়িত্ব অবহেলায় দুই রোগীর মৃত্যু
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (শেবাচিম) সেবিকাদের দায়িত্ব অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগে দুই রোগীর মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। রোববার (১৫ মার্চ) সকালে হাসপাতালের চতুর্থ তলার নাক-কান-গলা (ইএনটি) বিভাগের মহিলা ওয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন হেলেনা বেগম (৪৮), যিনি বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকার সারসী গ্রামের বাসিন্দা এবং শেফালি বেগম (৬০), যিনি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মহিপুর থানাধীন ডাবলুগঞ্জ ইউনিয়নের অধিবাসী।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ
হাসপাতাল সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হেলেনা বেগম গত ৫ রমজান থাইরয়েডজনিত সমস্যার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হন। অন্যদিকে শেফালি বেগম ১৮ রমজান মুখের ভেতরের টিউমার অপসারণের উদ্দেশ্যে ভর্তি হন। রোববার সকালে অস্ত্রোপচারের পূর্বে সেবিকারা তাদের শরীরে কয়েকটি ইনজেকশন প্রদান করেন। ইনজেকশন দেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই দুজনের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং তারা মৃত্যুবরণ করেন।
স্বজনদের বেদনাদায়ক অভিযোগ
হেলেনা বেগমের ছেলে ইব্রাহিম বলেন, "নার্স ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই আমার সুস্থ মা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যান। আমরা বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তবে আমরা কোনো মামলা করতে চাই না, কারণ মাকে হারানোর শোকের মধ্যে আর হয়রানির মুখে পড়তে চাই না।" শেফালি বেগমের মেয়ে খাদিজা বেগম বলেন, "সকালে নার্স এসে কয়েকটি ইনজেকশন দেওয়ার পরই আমার মা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষয়টি নার্সদের জানালেও তারা গুরুত্ব দেয়নি। চোখের সামনে আমার সুস্থ মা মুহূর্তেই মারা গেলেন। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।"
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
স্বজনদের অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার পর হাসপাতালের পরিচালক ওয়ার্ডে গিয়ে প্রাথমিকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখেছেন এবং সেবিকাদের অবহেলার বিষয়টি সামনে এসেছে। ওয়ার্ডে দায়িত্বরত সেবিকা হেলেন অধিকারী বলেন, তিনি ইনজেকশনের ভায়েল ভাঙেননি, এটি ভেঙেছেন সেবিকা মলিনা হালদার। তিনি শুধু অন্য দুই রোগীর শরীরে ইনজেকশন পুশ করেছেন। তবে ঘটনাটি দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অপর সেবিকা মলিনা হালদার বলেন, "চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী অপারেশনের আগে যে ইনজেকশন দেওয়ার কথা ছিল, সেটিই দেওয়া হয়েছে। পরে রোগীদের অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসককে মোবাইলে জানানো হয় এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।"
হাসপাতাল পরিচালকের বক্তব্য
হাসপাতালের নার্সিং তত্ত্বাবধায়ক খাদিজা বেগম বলেন, "সকালে হাসপাতালে এসে বিষয়টি জানতে পেরেছি। একই ওয়ার্ডে দুই রোগীর মৃত্যু অবশ্যই উদ্বেগজনক। হাসপাতাল পরিচালক যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তাতে আমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে।" এই বিষয়ে হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, "আজ ওই দুই রোগীরই শরীরের অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। এক্ষেত্রে কিছু ওষুধ রয়েছে অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার আগে দিতে হয় এবং কিছু ওষুধ অপারেশন থিয়েটারে নেয়ার পর দিতে হয়। অ্যানেসথেটিক ড্রাগ দেওয়ার পরে রোগীর এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে যা মেশিনের মাধ্যমে কাজ করাতে হয়, কিন্তু ওই ওষুধ সেবিকারা অপারেশন থিয়েটারে না নিয়ে আগে ওয়ার্ডে বসে দিয়েছেন। ফলে কিছুসময় পরে রোগীরা মৃত্যুবরণ করেন। এটি অবশ্যই পেশাদারিত্বে জায়গা থেকে দায়িত্ব অবহেলা এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।"
তিনি আরও বলেন, "দায়িত্ব অবহেলা, খামখেয়ালিপনা তো অবশ্যই আছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে জানিয়েছি, সেইসাথে রোগীর স্বজনরা ইচ্ছে করলে মামলাও দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে স্বজনদের সহযোগিতা করা হবে। আর ঘটনাটি ভুল হোক বা যাই হোকে শক্তভাবে দেখা না হলে ভবিষ্যতে আবার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।"
