কক্সবাজার সদর হাসপাতালে লিফটের নিচে নারী লাশ উদ্ধার, তদন্ত কমিটি গঠন
কক্সবাজার হাসপাতালে লিফটের নিচে নারী লাশ, তদন্ত চলছে

কক্সবাজার সদর হাসপাতালে লিফটের নিচে নারী লাশ উদ্ধার: তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে এক গৃহবধূর লাশ লিফটের নিচে তিন দিন ধরে পড়ে থাকার পর উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা ও হাসপাতালের সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঘটনার রহস্য উদ্‌ঘাটনে গত রোববার পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, যাদের সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ

পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া লাশটি উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের দক্ষিণ ডেইলপাড়ার বাসিন্দা নুরুল ইসলামের স্ত্রী কোহিনুর আক্তারের (৩১)। তিনি ৩ মার্চ পাঁচ বছরের অসুস্থ মেয়ে মরিয়মকে নিয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে আসেন। মরিয়মকে হাসপাতালের পঞ্চম তলার শিশু ওয়ার্ডের ২ নম্বর ইউনিটে ভর্তি করা হয়। পরদিন ৪ মার্চ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মেয়ের জন্য ওষুধ কিনতে নিচে যাচ্ছেন বলে ওয়ার্ড থেকে বের হন কোহিনুর। এরপর আর তিনি ফিরে আসেননি। তাঁর স্বামী কাতারপ্রবাসী হওয়ায় অনেক খোঁজাখুঁজির পরও সন্ধান না পেয়ে কোহিনুরের শ্বশুর আলী আকবর কক্সবাজার সদর মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরে শনিবার হাসপাতালের লিফটের নিচ থেকে কোহিনুরের লাশ উদ্ধার করা হয়।

হাসপাতালের প্রতিক্রিয়া ও তদন্ত

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক মং টিং নিও বলেন, লিফটের নিচ থেকে দুর্গন্ধ ছড়ানোর বিষয়টি জানতে পেরে হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়। সেখানে দেখা যায়, কালো বোরকা পরা এক নারী চতুর্থ তলায় হাত দিয়ে লিফটের দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। তখন লিফটটি পঞ্চম তলায় ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, লিফট না থাকা অবস্থায় তিনি ভেতরে ঢুকতে গিয়ে নিচে পড়ে যান। এ ঘটনা তদন্তে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার প্রধান করা হয়েছে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক আলী হোসেনকে। কমিটির সদস্য ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান ইয়াসির আরাফাত জানান, ‘প্রাথমিকভাবে এটি দুর্ঘটনা মনে হচ্ছে। তবে মৃত্যুর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

লিফটের অবস্থা ও রোগীদের আতঙ্ক

কক্সবাজার সদর হাসপাতাল ভবনে পাশাপাশি দুটি লিফট রয়েছে: একটি রোগী ও দর্শনার্থীদের জন্য, অন্যটি চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সংরক্ষিত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, এক যুগ আগে গণপূর্ত বিভাগ লিফট দুটি স্থাপন করে এবং প্রায় পাঁচ বছর আগে সর্বশেষ সংস্কার করা হয়। তবে হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘মাসখানেক ধরে একটি লিফটে ত্রুটি দেখা দেয়। হাত দিয়ে টান দিলেই এর দরজা খুলে যায়। লিফট সংস্কারের জন্য গণপূর্ত বিভাগে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যেই এ দুর্ঘটনা ঘটে গেল।’ গতকাল সোমবার সকালে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সাধারণ রোগীদের ব্যবহৃত লিফটের সামনে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন নারী-পুরুষ লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন, যা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা নির্দেশ করে।

পুলিশ ও প্রশাসনের বক্তব্য

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ছমি উদ্দীন বলেন, লিফটে ত্রুটি ছিল এবং তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে এলে ঘটনাটি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, তদন্তে কারও গাফিলতি প্রমাণিত হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতালটি প্রতিদিন এক হাজারের বেশি রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন এবং ১২টি ওয়ার্ডে প্রায় পাঁচ শতাধিক রোগী ভর্তি থাকেন, যা এ ধরনের নিরাপত্তা সংকটকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।