গাজীপুরের শ্রীপুরে জলাতঙ্ক টিকার তীব্র সংকট: ছয় মাস ধরে চলছে জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়
শ্রীপুরে জলাতঙ্ক টিকার সংকট: ছয় মাস ধরে জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়

গাজীপুরের শ্রীপুরে জলাতঙ্ক টিকার দীর্ঘমেয়াদি সংকট: জনস্বাস্থ্যে মারাত্মক হুমকি

গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলায় ছয় মাস ধরে জলাতঙ্ক বা র্যাবিস টিকার তীব্র সংকট বিরাজ করছে, যা স্থানীয় জনগণের জন্য একটি গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই সমস্যা শুধুমাত্র একটি জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কমবেশি একই ধরনের সংকট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জলাতঙ্ক একটি মারাত্মক রোগ, যার লক্ষণ প্রকাশ পেলে মৃত্যু প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই মৃত্যু রোধ করার একমাত্র উপায় হলো সময়মতো টিকার পূর্ণ ডোজ সম্পন্ন করা। অথচ, শ্রীপুরের বাসিন্দারা এই মৌলিক জনস্বাস্থ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা একটি উদ্বেগজনক পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।

টিকার চাহিদা বনাম সরবরাহ: একটি বিশাল ব্যবধান

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রীপুরে জলাতঙ্ক টিকার চাহিদা গত দুই বছরে বহুগুণ বেড়েছে। পূর্বে মাসে কয়েক শ ভায়াল টিকার প্রয়োজন হতো, কিন্তু বর্তমানে এই চাহিদা বেড়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন হাজারে। অথচ, উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো মোট চাহিদার মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ সরবরাহ করতে পারছে না। উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, সরকারি হাসপাতালে বড় একটি অংশ সরবরাহ করায় বাজারে এই ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কুকুর বা বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত রোগীরা যখন জীবন রক্ষাকারী এই টিকার জন্য হন্যে হয়ে ফার্মেসি থেকে ফার্মেসিতে ঘুরছেন, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও সরবরাহের ঘাটতি চরম উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।

অসম্পূর্ণ টিকা ডোজ: আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি

জলাতঙ্ক টিকার পাঁচটি ডোজের মধ্যে প্রথম এক বা দুটি ডোজ পাওয়া গেলেও পরবর্তী ডোজগুলো না পাওয়া রোগীদের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক। কারণ, নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে ডোজ সম্পন্ন না করলে টিকার কার্যকারিতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়। শ্রীপুরের মতো একটি শিল্পসমৃদ্ধ ও জনবহুল এলাকায় জীবন রক্ষাকারী ওষুধের এই অভাব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিড়াল-কুকুর পালনের শখ যেমন বেড়েছে, তেমনি রাস্তাঘাটে বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে কামড় বা আঁচড়ের ঘটনাগুলো নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই বর্ধিত চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকার মজুত বা সরবরাহ বাড়াতে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনার অভাব স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়।

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা

জলাতঙ্ক প্রতিরোধে সময়ক্ষেপণ করার কোনো সুযোগ নেই। বর্তমানে এই টিকা কেবল জেলা সদর বা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বিনা মূল্যে পাওয়া যায়। শ্রীপুরের মতো বড় উপজেলায় কেন সরকারিভাবে এর বরাদ্দ থাকবে না? উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবিলম্বে সরকারি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাণিজ্যিক স্বার্থের চেয়ে জনস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে খতিয়ে দেখতে হবে, কেন বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। কেবল টিকা দিলেই হবে না, পথের কুকুরের টিকাদান (এমডিভি) ও প্রজনন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জলাতঙ্ক নির্মূলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান

আমরা আশা করি, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত শ্রীপুরসহ সারা দেশে জলাতঙ্কের টিকার পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করবে। টিকার অভাবে একটি প্রাণও যেন অকালে ঝরে না যায়, সেটি নিশ্চিত করাই এখনকার প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, যাতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত থাকে এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে।