রাজশাহী মেডিকেলে আইসিইউ লিফট জালিয়াতি: তদন্তে ভুয়া কাগজপত্রের প্রমাণ
রাজশাহী মেডিকেলে আইসিইউ লিফট জালিয়াতি, তদন্তে প্রমাণ

রাজশাহী মেডিকেলে আইসিইউ লিফট জালিয়াতি: তদন্তে ভুয়া কাগজপত্রের প্রমাণ

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের জন্য সরবরাহ করা লিফটে জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের গঠিত তদন্ত কমিটি বলছে, জাপান থেকে আমদানির কথা বলা হলেও লিফটের প্রকৃত উৎস নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিভিন্ন প্যাকেজের যন্ত্রাংশ একত্র করে লিফটটি সরবরাহ করা হয়েছে, যা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

লিফট স্থাপনে বিলম্ব ও রোগীদের দুর্ভোগ

গত বছরের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে আইসিইউ ইউনিটে স্থাপনের জন্য সরবরাহ করা লিফটটি এখনো স্থাপন করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। লিফটটি হাসপাতালেই পড়ে আছে, যার ফলে পাঁচতলা ভবনে মুমূর্ষু রোগীদের ওঠানো-নামানোর জন্য কোনো বেড-কাম প্যাসেঞ্জারস লিফট নেই। রোগীর স্বজনদের বিকল্প লিফট ও সিঁড়ি ব্যবহার করে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

আইসিইউ ইউনিট নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১০ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা, যার মধ্যে লিফটের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশন সাধারণ প্যাসেঞ্জারস লিফট স্থাপন করে, যা মান নিয়ে অভিযোগের সৃষ্টি করে। ২০২৪ সালের জুন মাসে নিম্নমানের প্রমাণ পাওয়ায় আগের লিফটটি অপসারণ করা হয়, এবং ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর আরেকটি লিফট সরবরাহ করা হলেও তা এখনো স্থাপন হয়নি।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আইসিইউ ইউনিটের প্রধান আবু হেনা মোস্তফা কামালকে প্রধান করে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিতে চিকিৎসক ছাড়াও গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ছিলেন। তদন্ত শেষে গত ১ ডিসেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিফটের মূল অংশ ‘ট্রাকশন মোটর’ ও ‘কন্ট্রোল বক্স’ মূল প্যাকিং তালিকায় পাওয়া যায়নি। লিফট অর্ডারের ই-মেইল আইডির সঙ্গে ওয়েব পেজের সামঞ্জস্যতা নেই, এবং যাচাই শেষে ই-মেইল আইডি ভুয়া পাওয়া গেছে। বারকোড স্ক্যান করে ফুজিটেক কোম্পানির উল্লেখ নেই, এবং প্যাকেজিং লিস্টে বাংলাদেশি সরবরাহকারীর তথ্য অনুপস্থিত।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, লিফট একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিক ডিভাইস, এবং কোনো জানমালের অঘটন ঘটলে দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করা কঠিন হবে। তদন্ত কমিটির সব সদস্য একমত হয়েছেন যে ঠিকাদারের সরবরাহ করা লিফটটি স্থাপন করা যুক্তিযুক্ত হবে না। তাঁরা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করার কারণে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন।

গণপূর্ত বিভাগের বক্তব্য ও বিরোধ

গণপূর্ত বিভাগ দাবি করেছে যে সরবরাহ করা লিফটের সবকিছুই দরপত্রের শর্ত ও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী এসেছে। বিভাগের একটি কারিগরি কমিটি গত ২৮ জানুয়ারি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে লিফট স্থাপন, কমিশনিং ও পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা নেই। তবে এই কমিটিতে হাসপাতালের কোনো প্রতিনিধি ছিলেন না, যা বিরোধের সৃষ্টি করেছে।

গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হায়াত মুহাম্মদ শাকিউল আজম এখন ঢাকায় রয়েছেন, এবং তিনি প্রথম আলোকে বলেন যে আরেকটি তদন্ত হয়েছে, যার প্রতিবেদন দেখতে হবে। অন্যদিকে, হাসপাতালের মুখপাত্র শঙ্কর কে বিশ্বাস বলেছেন, বন্দরে খালাস করার আগেই পিএসআই করা বাধ্যতামূলক ছিল, কিন্তু ঠিকাদার আগেই মাল নিয়ে চলে আসে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভুয়া ই-মেইল ও ডোমেইন প্রস্তুত করে জালিয়াতি করা হয়েছে, এবং কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে অন্য তদন্তের প্রশ্ন ওঠে না।

ঠিকাদার সৈয়দ জাকির হোসেনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। এই ঘটনা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের নজরে আনা হয়েছে, এবং হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম গত ১৬ ফেব্রুয়ারি একটি চিঠি দিয়েছেন।

এই অনিয়মের ফলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, এবং রোগী সেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমাধান ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে।