এএমজেড হাসপাতালে ভুল রিপোর্টে শিশু আইরার অপচিকিৎসা
এএমজেড হাসপাতালে ভুল রিপোর্টে শিশুর অপচিকিৎসা

রাজধানীর বাড্ডার এএমজেড হাসপাতালের ভুল ল্যাব রিপোর্টের কারণে অপচিকিৎসার শিকার হয়েছে দুই বছর বয়সি শিশু আইরা। তার শরীরে প্রয়োগ করা হয়েছে উচ্চমাত্রার ব্যয়বহুল অ্যান্টিবায়োটিক। ঘটনাটি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে শিশুটির পরিবার।

ভুল রিপোর্টে চিকিৎসা শুরু

ঠান্ডা-কাশিতে আক্রান্ত হওয়ায় ৪ এপ্রিল আইরাকে নিয়ে তার পরিবার রাজধানীর বাড্ডায় এএমজেড হাসপাতালে যায়। হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মালেক মোল্লা শিশুটিকে দেখার পর বেশকিছু ওষুধ দেন। ওষুধ সেবনের এক সপ্তাহ পরও শিশুটি সুস্থ না হলে ১১ এপ্রিল পরিবারটি আবার ওই হাসপাতালে যায়। কিন্তু ডা. মালেক মোল্লা অসুস্থ থাকায় ওইদিন হাসপাতালের আরেক শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. জান্নাতুল মাওয়ার কাছে যায় শিশুটির পরিবার।

আগের চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ও রোগীকে দেখার পর ডা. জান্নাতুল মাওয়া বেশকিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা (সিবিসি, সিআরপি, ব্লাড সি/এস, ইউরিন সি/এস) করার পরামর্শ দেন। পরদিন ইউরিন সি/এস রিপোর্ট বাদে অন্য রিপোর্টগুলো নিয়ে শিশুটির পরিবার আবার ডা. মাওয়ার শরণাপন্ন হয়। রিপোর্ট দেখে তিনি ওরাল অ্যান্টিবায়োটিকসহ বেশকিছু ওষুধ দেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রথম রিপোর্টে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স

১৫ এপ্রিল ইউরিন সি/এসের রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর আবার ডা. মাওয়ার কাছে যায় ভুক্তভোগী শিশুর পরিবার। ইউরিনের রিপোর্ট দেখে ওই চিকিৎসক শিশুটিকে দ্রুত হাসপাতাল ভর্তি করার পরামর্শ দেন। ডা. মাওয়া জানান, শিশুটির মুখে খাওয়ার সব অ্যান্টিবায়োটিক ‘রেজিস্ট্যান্স’ বা অকার্যকর হয়ে গেছে। দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে ইঞ্জেকশন না দিলে বাচ্চার জীবন বিপন্ন হওয়ার আশঙ্ক রয়েছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ডা. মাওয়ার এমন কথায় আতঙ্কিত হয়ে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করে তার পরিবার। তবে ভর্তির আগে শিশুটির বাবা-মা ডা. মালেক মোল্লার শরণাপন্ন হন। সন্দেহের উদ্রেক হওয়ায় এ সময় শিশুটির বাবা মালেক মোল্লাকে পুনরায় রোগীর ইউরিন সি/এসের টেস্ট করানোর জন্য অনুরোধ করেন। ওইদিন ডা. মাওয়ার পরামর্শ অনুযায়ী শিশুটিকে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন পুশ করার আগে আবার ইউরিনের স্যাম্পল নেওয়া হয়। তবে দ্বিতীয়বার ইউরিনের স্যাম্পল নেওয়ার বিষয়টি ডা. মাওয়াকে জানানো হয়নি।

চার দিনের অপচিকিৎসা

যেহেতু ইউরিনের এই টেস্টটির রিপোর্ট পেতে কয়েকদিন সময় লাগে, ফলে ওইদিনই হাসপাতালে শিশুটিকে ভর্তি করা হয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তার শরীরে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন পুশ করা হয়। এভাবে টানা চারদিন তিনবেলা করে ছোট্ট শিশুর শরীরে উচ্চমাত্রার এ ইঞ্জেকশন পুশ করা হয়। এতে জ্বর কমলেও শিশুটি ধীরে ধীরে আগের চেয়ে আরও দুর্বল হয়ে যায়, অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকে।

দ্বিতীয় দফার ইউরিন সি/এসের রিপোর্ট ১৭ এপ্রিল কর্তৃপক্ষের হাতে এলেও অজানা কারণে পরদিন ১৮ এপ্রিল সেই রিপোর্ট শিশুটির পরিবারকে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় দফার রিপোর্ট হাতে আসতেই বেরিয়ে আসে আসল সত্য। প্রথম রিপোর্টে যা ‘রেজিস্ট্যান্স’ বা অকার্যকর দেখানো হয়েছিল, দ্বিতীয় রিপোর্টে সেখানে কোনো ‘ব্যাকটেরিয়াল গ্রোথ’ বা ইনফেকশনই পাওয়া যায়নি।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স গায়েব হওয়া চিকিৎসা বিজ্ঞানে অসম্ভব। এটি স্পষ্টতই ল্যাব রিপোর্ট জালিয়াতির প্রমাণ।

ভুক্তভোগী শিশুর মা সানজিদা আক্তার বলেন, প্রতিদিন তিনবার আমার বাচ্চাকে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের ভুল রিপোর্টের কারণে আমার সন্তান যে অপচিকিৎসার শিকার হয়েছে, তার সুষ্ঠু বিচার চাই। তিনি আরও বলেন, দ্বিতীয়বারের রিপোর্ট অনুযায়ী এ ওষুধের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। অথচ তারা আমার বাচ্চার শরীরে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক পুশ করেছে। এর প্রভাবে ভবিষ্যতে আমার মেয়ের কোনো সমস্যা হলে তার দায়ভার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে।

অপরদিকে এএমজেড হাসপাতালের রিপোর্টগুলো নিয়ে ১৮ এপ্রিল রাতে আজিমপুর মাতৃসদন শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের বিভাগীয় প্রধান ডা. নাদিরা আফরোজের কাছে যান ভুক্তভোগী শিশুর বাবা। রিপোর্টগুলো দেখে এ চিকিৎসক বলেন, রিপোর্টগুলোয় অসামঞ্জস্য রয়েছে। এ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে শিশুটিকে যে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

শিশুটির বাবা রেজোয়ান কবির বলেন, ভুয়া ল্যাব রিপোর্ট তৈরি করে তাদের শিশুকে হাসপাতালে ‘জিম্মি’ করে চার দিন চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সচেতন বাবা-মা হিসাবে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে বেঁচেছি।

হাসপাতালের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে এএমজেড হাসপাতালের অপারেশন বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার নাইম হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এ ঘটনায় রোগীর বাবা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ করেছিলেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছি। রোগীর স্বজনদের আমরা হাসপাতালে ডেকেছিলাম। কিন্তু তারা আসেননি।

ইউরিন সি/এসের প্রথম রিপোর্টে অনুযায়ী রোগীর মুখে খাওয়ার সব অ্যান্টিবায়োটিক ‘রেজিস্ট্যান্স’ বা অকার্যকর ছিল। কিন্তু রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা শুরু করার আগেই দ্বিতীয় দফায় আবার স্যাম্পল নেওয়া হয়। তিন দিনের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফার রিপোর্টে রোগীর কোনো সমস্যাই দেখা যায়নি। দুই রিপোর্টে কেন এত তারতম্য হলো জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

রোগীর স্বজনের অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো তদন্ত কমিটি করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।