মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নোংরা পরিবেশে চলছে চিকিৎসা, ডাস্টবিনের পাশেই মেঝেতে বিছানা
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নোংরা পরিবেশ, ডাস্টবিনের পাশে চিকিৎসা

মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে নোংরা পরিবেশে চলছে চিকিৎসা

রাজধানীর মহাখালীর সাততলা বস্তি এলাকায় অবস্থিত সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসার নামে চলছে এক ভয়াবহ দৃশ্য। ডাস্টবিনের কাছেই মেঝেতে বিছানা পেতে চলছে হামের মতো সংক্রামক রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা। হাসপাতালের ভেতর ও বাইরের পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা, যা রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, আশপাশের বস্তির অবস্থা ও জনবল সংকটের কারণে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

বিভিন্ন সংক্রামক রোগের চিকিৎসাকেন্দ্র

এই হাসপাতালে শুধু হামের চিকিৎসা হয় না, দেশে প্রায় সব ধরনের সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসা এখানে করা হয়। রোগের তালিকায় রয়েছে এইচআইভি/এইডস, ডায়রিয়া, বসন্ত, জলাতঙ্ক, ধনুষ্টংকার, কালাজ্বর, ডেঙ্গু, টাইফয়েড, ডিফথেরিয়া, ম্যালেরিয়া, অ্যানথ্রাক্স, নিউমোনিয়া ও ক্ষতের চিকিৎসা। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন মৌসুমে ভাইরাসজনিত রোগের চিকিৎসাও এখানে হয়। হাসপাতালটি অনেকের কাছে কুকুরে কামড়ানোর চিকিৎসার হাসপাতাল নামে পরিচিত, যেখানে প্রতিদিন জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়, তবে হামের টিকা দেওয়া হচ্ছে না।

বস্তির মধ্যে অবস্থান ও পরিবেশগত সমস্যা

হাসপাতালটি তিনটি পৃথক রাস্তা ধরে যাওয়া যায়, কিন্তু প্রতিটি রাস্তার দুই পাশে বস্তি ও ছোট দোকান রয়েছে। এই বস্তি জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জমিতে গড়ে উঠেছে, যার পাশেই আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, নার্সিং ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল অবস্থিত। বিগত সরকারগুলো বস্তি তুলে দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাইলেও তা সফল হয়নি। হাসপাতালের ভেতর দিয়ে বস্তির মানুষের যাতায়াতের রাস্তা রয়েছে, যেখানে দিনরাত মানুষ চলাচল করেন এবং সন্ধ্যার পর গাঁজার আসর বসে, যা হাসপাতাল প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

হামের সংক্রমণ ও ভর্তি রোগীদের অবস্থা

হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালটিতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। গত রোববার দেখা গেছে, চতুর্থ তলায় পা ফেলার জায়গা নেই, লিফটের সামনে, বারান্দায় ও ওয়ার্ডে হামে আক্রান্ত শিশু ও তাদের অভিভাবকরা ভিড় করছেন। দুটি বাথরুমের বারান্দায় চারটি শয্যা রয়েছে, বর্জ্য ফেলার বিন শয্যার কাছেই রাখা হয়েছে। কোথাও বৈদ্যুতিক পাখা নেই, একজন অভিভাবক নিজেই টেবিল ফ্যান কিনে ব্যবহার করছেন। ওয়ার্ডে নার্সদের বসার স্থানের পাশেই কালো, হলুদ ও সবুজ রঙের তিনটি বর্জ্য বিন রয়েছে, যা স্বাস্থ্যবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

পরিচ্ছন্নতার অভাব ও জনবল সংকট

বিভিন্ন তলা ও ওয়ার্ড ঘুরে পুরোনো ময়লা-আবর্জনা চোখে পড়েছে, যা নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না বলে বোঝা যায়। অভিভাবকরা বলেছেন, দিনে মাত্র একবার ঝাড়ু দেওয়া হয়। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এফ এ আসমা খান জানিয়েছেন, মাত্র ১৯ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়ে হাসপাতাল পরিষ্কার রাখা সম্ভব নয়। তিনি এক মাসেরও কম সময় আগে দায়িত্ব নিয়ে পরিবেশ উন্নত করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু সফল হচ্ছেন না বলে উল্লেখ করেছেন।

রোগীর সংখ্যা ও অভিভাবকদের ভূমিকা

হাসপাতালটি ১০০ শয্যার, কিন্তু গত সোমবার ১০৩ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। হামের জন্য বরাদ্দ ১৫টি শয্যায় ৬৩টি শিশু ভর্তি ছিল। অন্যান্য রোগীর মধ্যে এইডসের ১৭ জন, ডায়রিয়ার ১ জন, বসন্তের ৮ জন, জলাতঙ্কের ১ জন, ধনুষ্টংকারের ৮ জন, কালাজ্বরের ২ জন, ম্যালেরিয়ার ১ জন ও অ্যানথ্রাক্সের ১ জন রোগী রয়েছেন। প্রতিটি শিশুর সঙ্গে একাধিক অভিভাবক হাসপাতালে থাকেন, যারা খাওয়াদাওয়া ও ঘুমানোর কারণে পরিবেশ আরও নোংরা করছেন। কিছু অভিভাবক বিন ব্যবহার না করে শয্যার পাশেই আবর্জনা রাখেন বলে কর্মীরা অভিযোগ করেছেন।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো হাসপাতাল থেকে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে, কিন্তু সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে এই ঝুঁকি অনেক বেশি। সরকারের রোগত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন বলেছেন, এই পরিবেশে কোনো চিকিৎসা হয় না, এটি চিকিৎসার নামে প্রহসন। তিনি সরকারকে এখনই বাড়তি রোগীর চাপ সামলানো ও সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সাম্প্রতিক কিছু উন্নতি দেখালেও সবার সহযোগিতা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছেন।