রাজশাহী মেডিকেলে হামে আক্রান্ত শিশুদের ভোগান্তি: বারান্দায় চিকিৎসা, আইসিইউ সংকটে মৃত্যু
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য চিকিৎসা সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশেষায়িত ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে অনেক শিশুকে এখনো সাধারণ ওয়ার্ডের বারান্দায় চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, যা সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং রোগীদের অবস্থা আরও জটিল করে তুলছে।
আইসিইউ সংকট ও মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনা
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আজ সোমবার সকালে হাসপাতালটির নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) অপেক্ষমাণ তালিকায় ছিল হামে আক্রান্ত ২৩ শিশু। গত শনিবার এই সংখ্যা ছিল ৩৩, যা কমার পেছনে সুস্থতা নয়, বরং মৃত্যুকেই বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। হামের রোগীদের জন্য আইসিইউতে মাত্র ১২টি বেড রয়েছে, যা চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।
আইসিইউর অপেক্ষায় থাকতে থাকতেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ছয় মাস বয়সী গৌরি নামের এক শিশু অপেক্ষমাণ তালিকার ২৭ নম্বরে ছিল, কিন্তু দুই দিন অপেক্ষা করেও আইসিইউ না পেয়ে সে মারা যায়। পরদিন তার বাবাকে আইসিইউ থেকে ফোন করে ডাকা হলেও ততক্ষণে গৌরি আর এই পৃথিবীতে নেই। গত শনিবার দুপুরে হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গৌরীর মৃত্যু হয়, যাকে গত বুধবার ভর্তি করা হয়েছিল।
বারান্দায় শিশুদের বেদনাদায়ক অবস্থা
হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, শিশু ওয়ার্ডগুলোর বারান্দায় তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ওয়ার্ডের ভেতরে জায়গা না পেয়ে রোগী ও তাদের স্বজনেরা বারান্দাতেই অবস্থান করছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রোগীরা এই সংকটে পড়েছেন।
সাত মাস বয়সী উম্মে কুলসুম তার বাবা কামরুলের কোলে শুয়ে আছে হামের উপসর্গ নিয়ে। পাশেই মেঝেতে শুয়ে আছে চার বছরের ছেলে মুজাহিদ ইসলাম এবং বসে আছেন কামরুলের স্ত্রী সুমাইয়া বেগম। আজ রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় তাদের অবস্থান।
একই বারান্দায় ছয় মাস বয়সী শিশু সাইফকে পাওয়া যায়, যাকে প্রায় ৭ দিন আগে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। তার মা ফেনসি বেগম জানান, আট দিন ধরে শিশুটিকে নিয়ে বারান্দায় অবস্থান করছেন। চার মাস বয়সী শিশু মাহা এবং ১০ মাস বয়সী শিশু সোয়াতকেও সাধারণ রোগীদের সঙ্গে বারান্দায় রাখা হয়েছে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান ও উদ্যোগ
আজ সকাল পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৫ শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছে। এ সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৮ জন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১০৯ জন রোগী। এখন পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছে মোট ৬৭৬ জন, যার মধ্যে মারা গেছে ৫২ শিশু।
হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস বলেন, "হামের রোগীদের জন্য নির্ধারিত বেডসংখ্যা সীমিত। রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় সবাইকে ওয়ার্ডে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তবে দ্রুত আরও একটি ওয়ার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।"
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১৬ এপ্রিল সংক্রামক রোগের চিকিৎসার জন্য একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ উল ইসলাম আট সদস্যের এই বোর্ড গঠন করেন, যার সভাপতি করা হয়েছে শিশু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক শাহিদা ইয়াসমিনকে।
এদিকে আইসিইউ ওয়ার্ডের ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল আজ বিকেলে ঢাকার সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে যুক্ত হয়ে হাসপাতালের পরিস্থিতি তুলে ধরছেন। সেখানে অন্তত ১০০টি আইসিইউ বেডের দাবি জানানো হবে বলে আশা করা হচ্ছে।



