সম্প্রতি আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার পর রাজধানীর আরেক বেসরকারি শিশু হাসপাতাল ‘শ্যামলী বেবি কেয়ার’-এ অক্সিজেন লাইনে লিকেজের কারণে চার মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনা দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
ঢাকায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও মান
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জেলায় নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যা ৮২৭। এছাড়া নিবন্ধিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে ১ হাজার ৫৪৪টি এবং ব্লাড ব্যাংক রয়েছে ১৫২টি। বিপুল সংখ্যক এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরেজমিনে রাজধানীর মিরপুর এলাকার কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘুরে দেখা গেছে নানা অনিয়মের চিত্র। অনেক প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিক কিংবা আবাসিক ভবনের সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও হাসপাতালের পাশাপাশি একই ভবনে রয়েছে মাদ্রাসা, গার্মেন্টস কারখানা বা আবাসিক ফ্ল্যাট।
বিএমআই হাসপাতাল: নিবন্ধনের নামে বিভ্রান্তি
মিরপুরের ৬ নম্বর সেকশনে ৬তলা ভবনের দুটি ফ্লোর নিয়ে করা হয়েছে বিএমআই হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনেস্টিক সেন্টার। ভবনের তৃতীয় তলায় মাদ্রাসা, ওপরের তলায় আবাসিক ভবন। হাসপাতালের বাইরে টানানো ব্যানারে লেখা রয়েছে 'বি.এম.ডি.সি রেজিঃ নং- HSM 91356'। অথচ বিএমডিসি শুধু চিকিৎসকদের রেজিস্ট্রেশন দেয়, হাসপাতালের নয়। হাসপাতালে কোনো জরুরি বিভাগ নেই; একটি রুমকে ইমার্জেন্সি বিভাগ দেখানো হলেও সেখানে কোনো চিকিৎসক নেই।
মিরপুর হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল: গার্মেন্টসের সঙ্গে চিকিৎসা
মিরপুর ১ নম্বরের শাহ-আলী মাজারের অপরদিকে ৭ তলা ভবনে অবস্থিত ‘মিরপুর হলি ক্রিসেন্ট হসপিটাল অ্যান্ড ডায়গনেস্টিক কমপ্লেক্স’। নিচতলায় জরুরি বিভাগ, দোতলায় ডায়াগনস্টিক সেন্টার, তিন তলায় রোগীর বেড ও কেবিন, আর বাকি চারটি ফ্লোরে গার্মেন্টস। যেখানে প্রতিনিয়ত উচ্চ গান বাজছে আর মেশিনের শব্দে ভবন কাঁপছে। হাসপাতালের সিঁড়ি দিয়েই গার্মেন্টসের ভারী মালামাল উঠানামা করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের এখানে টোটাল বেড ২৬-২৭টি হবে। সব বেডই মোটামুটি ফিল আপ থাকে। মাঝেমধ্যে খালি থাকে কিছু কিছু। আমাদের এখানে আইসিইউ, এনআইসিইউ, সিসিইউ নেই।”
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নামে প্রতারণা
‘মিরপুর হলি ক্রিসেন্ট হসপিটাল অ্যান্ড ডায়গনেস্টিক কমপ্লেক্স’ কর্তৃপক্ষ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন (এনএসডিএ) কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত প্রশিক্ষণ দেওয়ার লিফলেট বিতরণ করছে। অথচ এনএসডিএ’র ওয়েবসাইটে ৩০টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের তালিকায় এই হাসপাতালের নাম নেই। এনএসডিএ এক বিজ্ঞপ্তিতে নকল/জাল জাতীয় দক্ষতা সনদ ও ফান্ড সংক্রান্ত প্রতারণা থেকে সাবধান থাকতে সতর্ক করেছে।
অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে চিকিৎসা: ডা. আমানত খান ও লতিফা জেনারেল হাসপাতাল
মিরপুর ১ নম্বর বাস স্ট্যান্ডের কাছে ডা. আমানত খান হাসপাতালে ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকলেও প্রাথমিক কিছু পরীক্ষা ছাড়া অন্যান্য পরীক্ষা বাইরের সেন্টার থেকে করিয়ে আনে। পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের সুবিধা নেই। স্থানীয় অনিক হোসেন অভিযোগ করে বলেন, “এই হাসপাতালে টাকা বেশি নেয়, কিন্তু সার্ভিস ভালো না। নার্সরা ঠিক মতো দেখভাল করে না এবং ভেতরের পরিবেশও পরিষ্কার না।”
লতিফা জেনারেল হাসপাতালের ভেতরেও অন্ধকার ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখা গেছে।
মেডিহোম হাসপাতাল: অন্ধকার ও দমবন্ধ পরিবেশ
মিরপুরের ৬০ ফিট রোডের কামাল সরণিতে মেডিহোম হাসপাতালের নিচতলায় অন্ধকার পরিবেশ, ছোট একটি রুমকে ‘জরুরি বিভাগ’ দেখানো হয়েছে। তিনতলায় কেবিন ও ওয়ার্ড, যেখানে নেই আলো-বাতাস চলাচলের জায়গা, অন্ধকার গুমোট পরিবেশ। এক রোগী বলেন, “এসে দেখলাম খুব একটা কম না। পরিবেশও তেমন ভালো না, দম বন্ধ হয়ে আসে।”
তদারকির অভাব ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য
হাসপাতালগুলোর অনিয়ম নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান ও মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসকে একাধিকবার ফোন দিয়েও পাওয়া যায়নি। গত মার্চে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অভিযানে রাজধানীতে ১৬টি বেসরকারি হাসপাতাল পরিদর্শন করে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়।
তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, “মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। জনস্বার্থে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই ধরনের শুদ্ধি অভিযান আগামীতেও অব্যাহত থাকবে।” তিনি আরও বলেন, “দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের মান উন্নয়নে কোনও ধরনের অননুমোদিত ও মানহীন ক্লিনিক চলতে দেওয়া হবে না।”



