বরিশালের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে স্থানীয় সরকারের সমন্বয় শীর্ষক এক গোলটেবিল সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা স্বাস্থ্য খাতে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর জোর দেন। ১৬ এপ্রিল বরিশালের একটি হোটেলের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, বেসরকারি হাসপাতাল ও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
স্বাস্থ্যসেবার বর্তমান অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, স্বাস্থ্য খাত দেশের সবচেয়ে বড় সেবা খাত, যার সঙ্গে কোটি মানুষের সুস্থ ও নিরাপদ জীবন জড়িত। তবে সেবার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যদি পেশার সঙ্গে একাত্ম না হন, তাহলে সেবায় ঘাটতি থাকবেই। দায়বদ্ধতা ছাড়া সেবার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগে. জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, হাসপাতালে জনবলসংকট ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বড় বাধা। অ্যাম্বুলেন্স, ডায়ালাইসিস ও ডায়াগনস্টিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট রোগীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। তবে প্রশাসনিক উদ্যোগে মোটরসাইকেল চলাচল বন্ধ, সৌন্দর্যবর্ধন ও সিসিইউর এসি চালু করা হয়েছে।
সমন্বয়ের গুরুত্ব
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ সন্তুষ্ট নন। অবকাঠামো ও জনবল বাড়ানোর চেষ্টা হলেও রোগীর চাপ অনেক বেশি। শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকেও সক্রিয় হতে হবে।
বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. এস এম মনজুর-এ-এলাহী বলেন, উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল। দালালের দৌরাত্ম্য কমেছে, তবে অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। পুরোনো হাসপাতাল ভবন, পানি পড়া ও ওষুধ সংরক্ষণের সমস্যা দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।
বেসরকারি খাতের ভূমিকা
বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার ওপর জনগণের আস্থার ঘাটতি রয়েছে। করোনাকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও জটিলতা বা মৃত্যু হলে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ আসে। লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় প্রয়োজন।
রাজনৈতিক দলের মতামত
বিএনপির বরিশাল জেলা দক্ষিণের সদস্যসচিব আবুল কালাম আজাদ শাহীন বলেন, চিকিৎসকের সংখ্যা কম, ডায়াগনস্টিক ও জরুরি সেবায় সংকট রয়েছে। সরকারি হাসপাতালে ৮০ শতাংশ দরিদ্র রোগী আসেন, তাঁদের জন্য সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
জামায়াতে ইসলামী বরিশাল মহানগরের নায়েবে আমির মাহমুদ হোসাইন দুলাল বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় সমন্বিত পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণ জরুরি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। ই-সেবা চালু করে রোগীর ভোগান্তি কমানো সম্ভব।
বাসদ বরিশাল জেলার সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, স্বাস্থ্য বাজেট কখনোই মোট বাজেটের ৫ শতাংশের বেশি হয়নি। বরাদ্দ বাড়ানো ছাড়া সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। রেডিওথেরাপি মেশিন অচল থাকায় ক্যান্সার রোগীদের ঢাকায় যেতে হচ্ছে।
সুপারিশ
সংলাপে অংশগ্রহণকারীরা বেশ কয়েকটি সুপারিশ করেন। সেগুলো হলো:
- স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
- সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা ও যৌথ তদারকি প্রাতিষ্ঠানিক করা।
- সরকারি হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টা ডায়াগনস্টিক ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করা।
- দালাল ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা চালু করা।
- দরিদ্র রোগীদের জন্য আর্থিক সহায়তা ও সনদ প্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজ করা।
- চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা ও স্যানিটেশন উন্নয়নে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা।
- জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও ই-স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা।
- ৯৯৯-এর মতো একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা হটলাইন চালু করা।
সঞ্চালক ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো, সংলাপটি পরিচালনা করেন।



