পোষা প্রাণী হিসেবে বিড়াল পালন এবং সিজোফ্রেনিয়া সম্পর্কিত মানসিক রোগের ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এক নতুন গবেষণায়। তবে গবেষকরা স্পষ্ট করে বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে বিড়াল সরাসরি সিজোফ্রেনিয়ার কারণ। বর্তমানে পাওয়া তথ্য কেবল দুই বিষয়ের মধ্যে একটি সম্পর্কের কথা বলছে, কারণ-ফলাফলের নয়।
গবেষণার বিবরণ
এ বিষয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী সিজোফ্রেনিয়া বুলেটিন-এ। অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড সেন্টার ফর মেন্টাল হেলথ রিসার্চের গবেষকেরা ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি মেটা বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনায় গত ৪৪ বছরে ১১টি দেশে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণার ফল বিশ্লেষণ করেন। গবেষণার নেতৃত্ব দেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জন ম্যাকগ্রা।
গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল
বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিড়ালের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে সিজোফ্রেনিয়া সম্পর্কিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। বিভিন্ন প্রভাবক উপাদান বিবেচনায় নেওয়ার পরও গবেষকেরা দেখতে পান, বিড়ালের সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।
সিজোফ্রেনিয়া কী?
সিজোফ্রেনিয়া এমন একটি জটিল মানসিক রোগ, যা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণে গভীর প্রভাব ফেলে। রোগটির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি জানা না গেলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, জিনগত বৈশিষ্ট্য, পরিবেশগত প্রভাব এবং মস্তিষ্কের জৈবিক পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে এটি বিকশিত হয়।
টক্সোপ্লাজমা পরজীবীর ভূমিকা
গবেষকদের মতে, বিড়াল ও সিজোফ্রেনিয়ার সম্ভাব্য সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। ১৯৯৫ সালেই একটি তত্ত্বে বলা হয়েছিল, প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া কোনো সংক্রমণ এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। পরবর্তীতে গবেষকদের নজর যায় টক্সোপ্লাজমা গন্ডি নামের একটি পরজীবীর দিকে, যা সংক্রমিত বিড়ালের মলের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা মাংস বা দূষিত পানির মাধ্যমেও এই সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশটিতে চার কোটিরও বেশি মানুষ এই পরজীবীতে আক্রান্ত। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, শরীরে প্রবেশের পর টক্সোপ্লাজমা গন্ডি দীর্ঘ সময় কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে অবস্থান করতে পারে এবং মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। অতীতের কিছু গবেষণায় এ পরজীবীর সঙ্গে ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন, মনোবৈকল্যজনিত উপসর্গ এবং সিজোফ্রেনিয়াসহ কিছু স্নায়বিক রোগের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এ সম্পর্ককে সরাসরি কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ এখনও মেলেনি।
বয়সের প্রভাব
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে বিড়ালের সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে পরবর্তী জীবনে সিজোফ্রেনিয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। আবার কয়েকটি গবেষণায় বিড়াল পালনকারীদের মধ্যে মনোবৈকল্যসদৃশ অভিজ্ঞতার স্কোর বেশি পাওয়া গেছে। তবে সব গবেষণার ফল এক নয়; অনেক গবেষণায় এমন কোনো সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পর্যালোচনায় অন্তর্ভুক্ত একটি গবেষণায় ১৩ বছর বয়সের আগে বিড়াল পালনের সঙ্গে সিজোফ্রেনিয়ার কোনো উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তবে ৯ থেকে ১২ বছর বয়সের মধ্যে বিড়ালের সংস্পর্শে আসার ক্ষেত্রে একটি সম্পর্কের ইঙ্গিত দেখা গেছে। ফলে কোন বয়সে সংস্পর্শে আসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সে বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়।
বিড়ালের কামড়ের প্রভাব
আরেকটি গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫৪ জন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত বিশ্লেষণে বিড়াল পালন ও স্কিজোটাইপি স্কোরের মধ্যে কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তবে যারা বিড়ালের কামড়ের শিকার হয়েছেন, তাদের স্কোর তুলনামূলক বেশি ছিল। এ ছাড়া কিছু গবেষণায় বিড়ালের কামড় এবং নির্দিষ্ট ধরনের মানসিক অভিজ্ঞতার মধ্যে সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, এর পেছনে পাস্তুরেলা মাল্টোসিডাসহ অন্যান্য জীবাণুও ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণার সীমাবদ্ধতা
তবে গবেষণাটির বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যালোচনায় অন্তর্ভুক্ত অধিকাংশ গবেষণাই ছিল কেস কন্ট্রোল ধরনের, যা কোনো সম্পর্কের কারণ নির্ধারণ করতে সক্ষম নয়। পাশাপাশি, অনেক ক্ষেত্রে এমন প্রভাবক উপাদান বিবেচনায় নেওয়া হয়নি, যা একই সঙ্গে বিড়ালের সংস্পর্শ ও মানসিক রোগের ঝুঁকিকে প্রভাবিত করতে পারে।
গবেষকদের মতে, বর্তমানে বিড়াল পালন এবং সিজোফ্রেনিয়া সম্পর্কিত রোগের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্কের কিছু প্রমাণ থাকলেও বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই সম্পর্কের প্রকৃতি ও সম্ভাব্য কারণ জানতে আরও বৃহৎ পরিসরের এবং উচ্চমানের গবেষণা প্রয়োজন।



