আপেলের বীজে কি মৃত্যু লুকিয়ে? বিজ্ঞান যা বলছে
আপেলের বীজে কি মৃত্যু লুকিয়ে? বিজ্ঞান যা বলছে

সম্প্রতি ‘মায়াপাখি’ নামক একটি নাটকের একটি দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নাটকের গল্পে দেখা যায়, আপেলের বীজ খাওয়ার পর নায়িকার মৃত্যু হয়। এরপর থেকেই অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে— আসলেই কি আপেলের বীজ এতটাই বিষাক্ত? ভুল করে কয়েকটি বীজ খেয়ে ফেললে কি জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে? বিষয়টি নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়লেও বিজ্ঞান এ বিষয়ে কী বলছে, সেটিই জানা জরুরি। চলুন, সহজ ভাষায় জেনে নেওয়া যাক আপেলের বীজের প্রকৃত সত্য।

আপেলের বীজে আসলে কী থাকে?

আপেলের বীজে একটি প্রাকৃতিক রাসায়নিক যৌগ থাকে, যার নাম অ্যামিগডালিন (Amygdalin)। এটি এমন একটি যৌগ, যা শুধু আপেলেই নয়, আরও অনেক ফলের বীজে পাওয়া যায়। যেমন—চেরি, এপ্রিকট, পিচসহ বিভিন্ন ফলের বীজে এই উপাদান বিদ্যমান। অ্যামিগডালিন নিজে সরাসরি বিষাক্ত নয়। তবে এটি শরীরে হজম হওয়ার সময় ভেঙে গিয়ে হাইড্রোজেন সায়ানাইড তৈরি করতে পারে, যা অত্যন্ত বিষাক্ত একটি রাসায়নিক পদার্থ হিসেবে পরিচিত।

তাহলে কি আপেলের বীজ খাওয়া বিপজ্জনক?

এখানেই রয়েছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি। আপেলের বীজ থেকে ক্ষতির ঝুঁকি মূলত নির্ভর করে পরিমাণ এবং কীভাবে বীজটি খাওয়া হচ্ছে, তার ওপর। সাধারণত কয়েকটি বীজ ভুলবশত গিলে ফেললে কোনো সমস্যা হয় না। কারণ বীজের বাইরের খোসা বেশ শক্ত হওয়ায় তা সহজে হজম হয় না। ফলে বীজের ভেতরের উপাদান বের হওয়ার আগেই তা শরীর থেকে বের হয়ে যায়। তবে যদি বীজগুলো চিবিয়ে বা গুঁড়ো করে খাওয়া হয়, তাহলে অ্যামিগডালিন মুক্ত হয়ে শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং সেখান থেকে সায়ানাইড তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু অল্প পরিমাণে এমন হলেও সাধারণত তা ক্ষতিকর পর্যায়ে পৌঁছায় না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কতটা খেলে বিপদ হতে পারে?

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য বিষক্রিয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে হলে অনেক বেশি পরিমাণ বীজ গ্রহণ করতে হবে। গবেষকদের মতে, বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছাতে প্রায় ১৫০ থেকে কয়েক হাজার চিবানো বীজ খেতে হতে পারে। অন্য হিসাবে, প্রায় ২০ থেকে ৪০টি আপেলের বীজ একসঙ্গে গুঁড়ো করে খেলে ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। অথচ একটি আপেলে সাধারণত মাত্র ৫ থেকে ৮টি বীজ থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবে আপেল খেতে গিয়ে দুর্ঘটনাবশত বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

সায়ানাইড কীভাবে শরীরকে ক্ষতি করে?

যদি শরীরে অতিরিক্ত পরিমাণ সায়ানাইড প্রবেশ করে, তাহলে এটি কোষের অক্সিজেন ব্যবহারের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে শরীর এক ধরনের ‘অভ্যন্তরীণ শ্বাসরোধ’ অবস্থার মধ্যে পড়ে যায়। এর ফলে দেখা দিতে পারে— মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব বা বমি, শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যু। তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার জন্য যে পরিমাণ সায়ানাইড প্রয়োজন, তা সাধারণভাবে আপেলের কয়েকটি বীজ খাওয়ার মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব নয়।

তাহলে আপেল খাওয়া কি নিরাপদ?

অবশ্যই নিরাপদ। আপেল বিশ্বের অন্যতম স্বাস্থ্যকর ফল হিসেবে বিবেচিত। এতে রয়েছে প্রচুর ফাইবার, ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং বিভিন্ন উপকারী পুষ্টি উপাদান, যা হৃদ্‌স্বাস্থ্য, হজমশক্তি ও সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই আপেল খাওয়ার কারণে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

সতর্কতা

যদিও সাধারণভাবে আপেলের বীজ ক্ষতির কারণ হয় না, তবুও কিছু সতর্কতা মেনে চলা ভালো—

  • ইচ্ছাকৃতভাবে বেশি পরিমাণ বীজ খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।
  • শিশুদের আপেল খাওয়ানোর সময় বীজ আলাদা করে দেওয়া ভালো।
  • বীজ চিবিয়ে বা গুঁড়ো করে খাওয়ার অভ্যাস থাকলে তা পরিহার করুন।

আপেলের বীজে বিষাক্ত যৌগ রয়েছে—এ কথা সত্য। তবে সেই তথ্যকে কেন্দ্র করে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ বাস্তবে কয়েকটি আপেলের বীজ খেয়ে বিষক্রিয়া বা মৃত্যুর ঝুঁকি অত্যন্ত কম এবং প্রায় অসম্ভব। সুতরাং আপেল খাওয়ার সময় ভুল করে একটি-দুটি বীজ চলে গেলেও উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফল নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। নাটক বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের চেয়ে বৈজ্ঞানিক সত্যকে গুরুত্ব দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।