রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বার্ধক্য ঠেকাতে ২৬ বিলিয়ন ডলারের একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প চালু করেছেন। এই প্রকল্পের আওতায় বিজ্ঞানীরা কোষের বার্ধক্য ধীর করার জন্য জিন-থেরাপি চিকিৎসা তৈরি করছেন। পাশাপাশি থ্রিডি অর্গান প্রিন্টিং ও জেনোট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুতিনের দীর্ঘায়ু প্রকল্পের পটভূমি
গত বছর বেইজিংয়ে এক সামরিক কুচকাওয়াজ চলাকালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে পুতিনের একটি ঘরোয়া আলাপচারিতা ফাঁস হয়েছিল, যেখানে তিনি অমরত্ব অর্জনের বিষয়ে কথা বলেন। পরে জানা যায়, এটি আসলে ক্রেমলিন-সমর্থিত একটি বৈজ্ঞানিক প্রকল্পের বিবরণ ছিল। বর্তমানে এই প্রকল্প রাশিয়ার অন্যতম প্রধান বিজ্ঞান প্রকল্পে পরিণত হয়েছে।
প্রকল্পের মূল উপাদান
পুতিন কর্তৃক নিযুক্ত রুশ রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞানীরা প্রধানত দুটি প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন:
- বায়োপ্রিন্টিং: জীবন্ত টিস্যুর থ্রিডি প্রিন্ট করা।
- জেনোট্রান্সপ্ল্যান্টেশন: জিনগতভাবে মানুষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশেষ জাতের ছোট শূকরের শরীরের ভেতরে মানুষের অঙ্গ তৈরি করা।
ইতোমধ্যে রুশ বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের থাইরয়েড গ্রন্থি ও মানুষের তরুণাস্থি বায়োপ্রিন্ট করতে সক্ষম হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তির সাহায্যে মানবদেহের অঙ্গ প্রতিস্থাপন শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জিন-থেরাপি ও কোল্ড থেরাপি
গত মাসে রাশিয়ার সরকার ঘোষণা করেছে, 'নিউ হেলথ প্রিজারভেশন টেকনোলজিস' প্রকল্পের অংশ হিসেবে বিজ্ঞানীরা কোষের বার্ধক্য ধীরগতির করার জন্য একটি জিন-থেরাপি চিকিৎসা তৈরি করছেন। রাশিয়ার উপবিজ্ঞানমন্ত্রী ডেনিস সেকিরিনস্কি বলেন, কোষের বার্ধক্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই ওষুধ অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল একটি মাধ্যম। এছাড়া মাইনাস ১৭০ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় কোল্ড থেরাপির মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রকল্পের লক্ষ্য ও সমালোচনা
২০২৪ সালে উন্মোচিত এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য দশকের শেষ নাগাদ (২০৩০ সালের মধ্যে) ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষের জীবন বাঁচানো। তবে সমালোচকেরা বলছেন, এই সংখ্যার সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত রুশ সেনাদের আনুমানিক সংখ্যার এক অদ্ভুত মিল রয়েছে।
ক্রেমলিনের প্রেস সার্ভিস জানিয়েছে, রাশিয়ান ফেডারেশনে এই ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক কর্মসূচির একটি সম্পূর্ণ পরিসরের কাজ চলছে, যা রাষ্ট্র দ্বারা সমর্থিত এবং বহু গবেষণা প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে।
নেতৃত্ব ও বিতর্ক
পুতিনের এই দীর্ঘায়ু অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছেন তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দুই ব্যক্তি। একজন হলেন পুতিনের মেয়ে মারিয়া ভোরোনৎসোভা, যিনি একজন হরমোন বিশেষজ্ঞ এবং এই জিনপ্রযুক্তি কর্মসূচির তদারকি করছেন। অন্যজন হলেন বিতর্কিত পদার্থবিদ মিখাইল কোভালচুক, যিনি সোভিয়েত আমলের পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র কুর্চাতভ ইনস্টিটিউটের প্রধান।
কোভালচুক রাশিয়ার গণমাধ্যমকে বলেন, অমরত্ব নিয়ে আলোচনা করা কঠিন, তবে মানুষকে মেরামত করার সক্ষমতা যে সামনে বাড়বে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতির অভাব
পশ্চিমা গবেষণার মতো এই প্রকল্পের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত হয়নি। রাশিয়ায় বায়োপ্রিন্টিংয়ের অন্যতম পথিকৃৎ বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ওস্ত্রভস্কি, যিনি ইউক্রেন আক্রমণের পর দেশ ছেড়েছেন, তিনি বলেন, "যদি কোনো আন্তর্জাতিক প্রকাশনা না থাকে, তবে বুঝতে হবে, সেখানে বাস্তবসম্মত কোনো ফলাফল নেই। এগুলোকে ফলাফলের চেয়ে স্বপ্ন বলাই ভালো।" তিনি আরও বলেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার বিজ্ঞান বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন, এবং বিজ্ঞানীরা পুতিনকে তা-ই শোনাচ্ছেন যা তিনি শুনতে চান, যাতে তহবিল পাওয়া যায়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বার্ধক্যকে জয় করার এই আকাঙ্ক্ষা রুশ শাসকদের জন্য নতুন নয়। ১৯২০-এর দশকে সোভিয়েত বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার বোগদানভ রক্ত পরিবর্তনের মাধ্যমে তারুণ্য ধরে রাখার পরীক্ষা চালিয়েছিলেন, কিন্তু নিজের শরীরে পরীক্ষা করতে গিয়ে ৫৫ বছর বয়সে মারা যান। ১৯৩০-এর দশকে জোসেফ স্তালিনের প্রশংসাধন্য চিকিৎসক ওলেকসান্দর বোগোমলেটস দাবি করেছিলেন মানুষ ১৫০ বছর বাঁচতে পারে, কিন্তু তিনি নিজে ৬৫ বছর বয়সে মারা যান। পুতিনের 'ব্যক্তিগত জেরন্টোলজিস্ট' ভ্লাদিমির খাভিনসন দাবি করেছিলেন মানুষ ১২০ বছর বাঁচবে, তিনিও ২০২৪ সালে ৭৭ বছর বয়সে মারা যান।
৭৩ বছর বয়সি পুতিন দীর্ঘদিন ধরে নিজের শারীরিক সক্ষমতার প্রদর্শন করে আসছেন, কিন্তু বাস্তবে রাশিয়ায় পুরুষদের গড় আয়ু মাত্র ৬৮ বছর, যা যুক্তরাষ্ট্রের ৭৬ এবং পশ্চিম ইউরোপের ৮০ বছরের তুলনায় অনেক কম।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্রেমলিনের জন্য নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করা যতটা সহজ, জীববিজ্ঞানের অমোঘ নিয়ম অর্থাৎ মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়া সম্ভবত ততটাই কঠিন।



