জনপ্রিয় হেডফোনে ক্যানসারের ঝুঁকি: ইউরোপীয় গবেষণায় বিপিএ ও বিপিএস রাসায়নিকের উপস্থিতি
হেডফোনে ক্যানসার ঝুঁকি: গবেষণায় বিপিএ-বিপিএস রাসায়নিক

জনপ্রিয় হেডফোনে ক্যানসারের ঝুঁকি: ইউরোপীয় গবেষণায় বিপিএ ও বিপিএস রাসায়নিকের উপস্থিতি

একটি নতুন ইউরোপীয় গবেষণায় বাজারের বহুল ব্যবহৃত হেডফোনে মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষকরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে এসব হেডফোন ব্যবহার করলে ক্যানসারসহ বিভিন্ন গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেতে পারে।

গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল

'টক্সফ্রি লাইফ ফর অল' প্রকল্পের আওতায় সম্প্রতি ৮১টি ইন-ইয়ার ও ওভার-ইয়ার হেডফোনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। মজার বিষয় হলো, পরীক্ষিত প্রতিটি হেডফোনেই এমন রাসায়নিক উপাদান পাওয়া গেছে যা মানুষের হরমোন সিস্টেমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে সক্ষম।

বোস, প্যানাসনিক, স্যামসাং এবং সেনহাইজারের মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের হেডফোনেও এই বিপজ্জনক রাসায়নিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন গবেষকরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, হেডফোনের প্লাস্টিক অংশ থেকে ধীরে ধীরে রাসায়নিক পদার্থ বের হয়ে ব্যবহারকারীর ত্বকের সংস্পর্শে আসে এবং পরবর্তীতে তা শরীরে শোষিত হয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।

হরমোন ব্যাহতকারী রাসায়নিকের প্রভাব

গবেষক দল মূলত এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টিং বা হরমোন ব্যাহতকারী রাসায়নিকের উপস্থিতি পরীক্ষা করেছেন। তাদের গবেষণায় বিপিএ (বিসফেনল-এ) এবং বিপিএস (বিসফেনল-এস) নামক দুটি রাসায়নিকের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যেগুলো 'চিরস্থায়ী রাসায়নিক' হিসেবে পরিচিত।

এই রাসায়নিকগুলো মানবদেহে নারী হরমোন ইস্ট্রোজেনের মতো কাজ করতে পারে, যার ফলে নানাবিধ স্বাস্থ্যগত সমস্যা দেখা দিতে পারে:

  • মেয়েদের মধ্যে বয়ঃসন্ধি আগেভাগে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা
  • পুরুষদের হরমোনের ভারসাম্যে পরিবর্তন
  • দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি

পরিসংখ্যান ও নিরাপদ সীমা অতিক্রম

পরীক্ষিত হেডফোনের প্রায় ৯৮ শতাংশ নমুনায় বিপিএ রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, বিপিএস রাসায়নিক তিন-চতুর্থাংশের বেশি হেডফোন নমুনায় শনাক্ত করা হয়েছে।

চিন্তার বিষয় হলো, কিছু হেডফোনে এই রাসায়নিকের মাত্রা প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ ৩১৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা ইউরোপীয় কেমিক্যালস এজেন্সির নির্ধারিত নিরাপদ সীমা (১০ মিলিগ্রাম প্রতি কেজি) থেকে অনেকগুণ বেশি।

সেনহাইজার অ্যাকসেন্টাম ট্রু ওয়্যারলেস এবং বোস কুইটকমফোর্টের মতো জনপ্রিয় মডেলের হেডফোনে এই নিরাপদ সীমা অতিক্রম করার ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

গবেষকদের সতর্কতা ও সুপারিশ

গবেষকরা পরিষ্কারভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে হেডফোন ব্যবহার করলে ত্বকের মাধ্যমে এই ক্ষতিকর রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করতে পারে। পূর্ববর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, ঘামের সঙ্গে বিপিএ ও বিপিএস মিশে ত্বক থেকে সহজেই শোষিত হতে পারে, যা স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

টক্সফ্রি লাইফ ফর অল-এর প্রধান এমেসে গুলিয়াস ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের দ্রুত হরমোন-ব্যাহতকারী সব রাসায়নিক নিষিদ্ধ করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, কঠোর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই ভোক্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

এই গবেষণা ফলাফল হেডফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে নতুন করে সচেতনতা তৈরি করেছে এবং ভোক্তা সুরক্ষা নীতিমালা পুনর্বিবেচনার দাবি জানাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, হেডফোন কেনার সময় গুণগত মান ও নিরাপত্তা সনদ সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত এবং সম্ভব হলে কম সময় হেডফোন ব্যবহার করার চেষ্টা করা উচিত।